
বৃষ্টি নামলেই ঘুম উড়ে যায় পঁয়ান্ন বছর বয়সী চান্দু মিয়ার চোখ থেকে। ঘরের সামান্য যা কিছু জিনিসপত্র আছে, তা বাঁচাতে ছুটে গিয়ে পলিথিন দিয়ে জড়িয়ে ধরতে হয় তাকে। বাতাসে সেই পলিথিনের খসখস শব্দ, আর মাথার ওপর অঝোর বৃষ্টির রিমঝিম ,যা অন্য কারও কাছে হয়তো এক টুকরো রোমান্টিকতা, চান্দু মিয়ার বুক থেকে তা টেনে বের করে আনে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের মন্ডলবাড়ি-সংলগ্ন কান্দাপাড়া এলাকার এই বাসিন্দা এখন প্রতিদিন লড়ছেন এক নীরব যুদ্ধে।নিজের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, আর দারিদ্র্যের সঙ্গে।
এক ঝড়ে বদলে যাওয়া জীবন
গত বছরের এক ঝড়ে চান্দু মিয়ার বসতঘরের চালটুকু উড়ে যায় নিমেষেই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ঘরটি আর মেরামত করার সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি তার। পুরো একটি বছর ধরে বৃষ্টি আর শীতের কনকনে বাতাস একসঙ্গে সহ্য করে কাটাতে হয়েছে তাকে ও তার স্ত্রী ময়না বেগমকে।
শেষমেশ উপায় না দেখে তারা এখন আশ্রয় নিয়েছেন ছেলের রেখে যাওয়া একটি জীর্ণশীর্ণ, পরিত্যক্ত ঘরে।যে ঘরের চেহারাই যেন বলে দেয় দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা। সেই ঘরেরও টিনের চালে আর বেড়ায় অসংখ্য ফুটো। বৃষ্টি হলেই পানি গড়িয়ে মেঝে হয়ে যায় কাদাময়। তখন বৃদ্ধ দম্পতিকে আশ্রয় নিতে হয় প্রতিবেশীর বাড়িতে। আবার ছেলে বাড়ি ফিরলে বাবা-মায়ের থাকার জায়গাটুকুও হয়ে পড়ে আরও সংকীর্ণ।
মাসে মাত্র ৫০০ টাকায় সংসার
চান্দু মিয়ার স্ত্রী ময়না খাতুন জানান, একসময় দিনমজুরের কাজ করতেন তার স্বামী। কিন্তু বয়সের ভারে এখন আর সেই শারীরিক সক্ষমতা নেই। বর্তমানে স্থানীয় একটি চালকলে কাজ করে মাসে তিনি পান মাত্র ৫০০ টাকা আর সামান্য কিছু ভাঙা চাল।
তা দিয়েই কোনোরকমে টেনে নিচ্ছি সংসার। স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস নেই, কোনো সরকারি সহায়তা কার্ডও পাই নাই। সম্বল বলতে সামান্য এক খণ্ড জমি, আর তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা ভাঙাচোরা ঘর বলছিলেন ময়না খাতুন।
তার কণ্ঠে ক্ষোভও ঝরে পড়ে,এলাকায় বহু জনপ্রতিনিধি এসেছেন-গেছেন, কিন্তু এই বৃদ্ধ দম্পতির দুর্দশার খোঁজ রাখার মতো কেউ এগিয়ে আসেননি। থাকার ঘরটি বসবাসযোগ্য হলে হয়তো খেয়ে না খেয়ে হলেও অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারতেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম মন্ডল বলেন, চান্দু মিয়া গ্রামের সবচেয়ে অসহায় পরিবারগুলোর একটি। দিনমজুরদের চেয়েও কঠিন অবস্থায় দিন কাটছে তার। তিনি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও বিত্তবানদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন তারা এই পরিবারের পাশে দাঁড়ান। তার ভাষায়, বর্তমান সময়ে মাসে মাত্র ৫০০ টাকায় একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব।কিন্তু চান্দু মিয়া সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে টিকে আছেন প্রতিদিন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চৌকিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাসানুল করিম পুটু বলেন, স্থানীয় মেম্বার এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন, তিনি নিজে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তবে ইউনিয়ন পরিষদ ও ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন তিনি, এবং বয়স হলে সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করারও প্রতিশ্রুতি দেন।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামীও জানান, তিনিও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলেন। তিনি জানান, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চান্দু মিয়া ও ময়না বেগমের গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়।এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষদের নীরব লড়াইয়ের একটি প্রতিচ্ছবি। যেখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায় না, যেখানে বার্ধক্যেও মেলে না বিশ্রাম, সেখানে বেঁচে থাকাটাই যেন প্রতিদিনের এক যুদ্ধ। ঝড় তাদের ঘরের চাল কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু কেড়ে নিতে পারেনি বেঁচে থাকার সেই নিঃশব্দ জেদ।
মন্তব্য করুন