
বগুড়ার ধুনট উপজেলায় একের পর এক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে বসতবাড়ি, দোকানপাট, গরুর খামার, মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে শুরু করে অটোরিকশা, ব্যাটারি ও মোটরসাইকেল চুরির অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এসব ঘটনায় কোথাও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কিংবা লিখিত অভিযোগ করা হলেও অনেক ঘটনায় এখনো অপরাধীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
চুরির তালিকায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে গরু চুরি। রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধভাবে বাড়ি ও খামারে ঢুকে গরু নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুদ্র খামারি ও গৃহস্থদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই এখন রাত জেগে গবাদিপশু পাহারা দিচ্ছেন।
প্রকাশ্য দিবালোকে মোবাইলের দোকানে চুরি
সর্বশেষ ধুনট বাজারের ইছামতি মার্কেটে প্রকাশ্য দিবালোকে মাসুদ টেলিকমে বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটে। বুধবার সকাল ৮টার দিকে মার্কেটের নাইট গার্ড গেট খুলে নাশতা করতে যাওয়ার সুযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্র দোকান থেকে প্রায় ৯৪টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
পরে অভিযান চালিয়ে যমুনা সেতু পশ্চিম থানা পুলিশ আন্তজেলা চোরচক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে ধুনট হাসপাতাল রোডের মিলন স্টোরেও চুরি হয়। পার্শ্ববর্তী একটি সেলুনের টিন কেটে দোকানের ওপর দিয়ে প্রবেশ করে নগদ টাকা ও বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায় চোরেরা।
গরু চুরিতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক
গত ৩০ আগস্ট মথুরাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াহাটা গ্রামে দরজায় তালা দেওয়া অবস্থায় অস্ত্র প্রদর্শন করে চারটি গরু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলামিনের তিনটি গরুর আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা। একই ঘটনায় তাঁর প্রতিবেশী মালা বক্সের একমাত্র গরুটিও চুরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা।
একই গ্রামের বৃদ্ধ আলেয়ারের গরু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও এলাকাবাসী টের পেয়ে যাওয়ায় গরুটি রেখে পালিয়ে যায় চোরেরা।
এর আগে গত ২ আগস্ট গোপালপুর-খাদুলী চারমাথা বাজার এলাকা থেকে গোলাম মোস্তফার প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের সাত মাসের গাভিন গরু চুরি হয়।
মথুরাপুর ইউনিয়নের খাদরে গ্রামের মো. রজিবুল ইসলাম মোহাব্বত বলেন, শুধু তাঁর বাড়ি নয়, আশপাশের অনেক বাড়িতেও গরু চুরি হয়েছে। তাঁর এক লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাভি চুরি করে নিয়ে যায় চোরেরা। তবে বাছুরটি নিতে না পারায় সেটি রেখে যায়।
একই ইউনিয়নের সিংহেরপাড়া এলাকার মো. একরামুল হোসেনের তিনটি গরু গত ২১ সেপ্টেম্বর চুরি হয়। তাঁর ভাষ্য, রাত ২টার দিকে গরু দেখে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে তাঁর স্ত্রী গোয়ালে গিয়ে দেখেন কোনো গরু নেই। চুরি যাওয়া গরুর মধ্যে একটি সাত মাসের গাভিন এবং অন্যটির মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। এ ঘটনায় থানায় জিডি করলেও পরে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের তোফিজ উদ্দিন সরকারের চারটি গরুও একই রাতে চুরি হয়। গরুগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা। তাঁর নাতি ইয়াসিন আরাফাত বলেন, থানায় অভিযোগ করার পরও তাঁরা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে পাননি।
ক্ষুদ্র খামারি মো. আবুল কালাম বলেন, তাঁরা দুই-তিনটি করে গরু পালন করে সংসার চালান। চুরির ভয়ে এখন রাতে ঘুম না গিয়ে গরু পাহারা দিতে হচ্ছে। একটি গরু চুরি হয়ে গেলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।
মসজিদ-বাড়ি-দোকানেও চোরের হানা
গত ১০ আগস্ট চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা পূর্বপাড়া জামে মসজিদের জানালার গ্লাস ভেঙে ও গ্রিল কেটে মাইক, মাইক্রোফোন, তারসহ প্রায় ৬০ হাজার টাকার মালামাল চুরি হয়। মসজিদের সৌর ব্যাটারিও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
গত ২০ আগস্ট নিমগাছী ইউনিয়নের ধামাচামা গ্রামের উত্তরপাড়ায় খোকা পরামানিকের ছেলে রাজিবুল হক রিজুর বাড়িতে সিঁধ কেটে স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়। তিনি বলেন, চোরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় নিজের বাড়িতেও এখন নিরাপদ বোধ করছেন না।
গত ১১ আগস্ট ধুনট পাইলট স্কুল মার্কেটের একটি দোকানের তালা কাটার চেষ্টা করে চোরেরা। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
৯ আগস্ট গোবিন্দপুর বাজারের ইউসুফ স্টোরে চুরি হয়। রাত ১০টার দিকে দোকান বন্ধ করে মালিক বাড়িতে খাবার খেতে যাওয়ার পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে দোকানের টিনের বেড়া কেটে প্রায় সাত হাজার টাকা নগদ ও দেড় লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায় চোরেরা।
দোকানমালিক আব্দুল হামিদ বলেন, চোরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর পাশের শাহ আলমের দোকানেও এর আগে এক লাখ টাকা নগদসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়েছিল। থানায় অভিযোগ করেও কার্যকর অগ্রগতি না পাওয়ায় অনেকেই অভিযোগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
গত ১৬ আগস্ট উজান সিং গ্রামের মধ্যপাড়ায় একটি দোকানের টিনের চাল কেটে দুই লাখ টাকা নগদসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
অটোভ্যান, ব্যাটারি ও ছিনতাইও বাড়ছে
গত ১৯ সেপ্টেম্বর মথুরাপুর বাজার থেকে অটোভ্যান চুরি করে পালানোর সময় সিএনজির সঙ্গে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন শেরপুরের বটতলার শেখ সাদী। পরে স্থানীয়রা তাঁকে আটক করেন।
এর প্রায় ১৫ দিন আগে উত্তর অফিসারপাড়া এলাকার রাসেল বাবুর অটোরিকশা থেকে ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায় চোরেরা।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ধুনট থানার মাত্র কয়েকশ গজ দূরে বাঁশহাটা গ্রামের অটোচালক জয়ের অটো অস্ত্রের মুখে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর রজিবুল ইসলাম নামে একজনকে ছিনতাই হওয়া অটোসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া গত ১১ আগস্ট ফড়িংহাটা গ্রামে ছাগল চুরির সময় সুদীপ সরকার নামে একজনকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কিন্তু এখনো কাউকে আটক করা হয়নি। একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটায় তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের আবু তালেব বলেন, বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের একা রাখতেও এখন ভয় লাগে। দ্রুত চুরির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবসতি থেকে কিছুটা দূরে থাকা বাড়ি, যেসব বাড়িতে পুরুষ সদস্য কম এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই—সেসব বাড়ি, দোকান ও খামারই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় গরুর খামার ও বাড়িঘর নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, ধারাবাহিক চুরির ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সমন্বিত অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাতের পাহারা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোও তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য করুন