
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে (কুবি) টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও সবুজ ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে কৌশলগত কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) এ কর্মশালার আয়োজন করে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় উপাচার্যের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘ডেভেলপিং স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর সাসটেইনেবল গ্রিন ক্যাম্পাস অব কুমিল্লা ইউনিভার্সিটি’ শীর্ষক কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়। ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আলী রেজওয়ান তালুকদার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও আইকিউএসি পরিচালক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান।
এ সময় বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য ড. জসিম উদ্দিন আহমদ, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান শাখার সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরী, অর্থনীতি শাখার সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হায়দারসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানরা।
কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ক্যাম্পাস সবুজায়ন, টেকসই পরিবহন, পানি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের আশপাশের পর্যটন কার্যক্রমের কারণে পরিবেশের ওপর সৃষ্ট চাপ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান হাবিব বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই গ্রিন ক্যাম্পাসে রূপ দিতে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পাহাড়ি ভূমির বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে অবকাঠামো নির্মাণের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবনের শুরু থেকেই পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে ফার্মেসি ও রসায়ন গবেষণাগারের রাসায়নিক তরল বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলা বন্ধ করতে হবে। সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও কাগজের অপচয় কমানোর পাশাপাশি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, ক্যাম্পাসে যানবাহনের ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় বৃক্ষরোপণকে কার্যক্রমের অংশ করা গেলে ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে তা ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর ও টেকসই মডেল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন আহমদ বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখে পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু সচেতনতা নয়, পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। পলিথিন ব্যবহার কমানো ও পানির অপচয় রোধের মতো অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও তরুণদের পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, টেকসই গ্রিন ক্যাম্পাসের পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচলিত 3R—Reduce, Reuse ও Recycle-এর সঙ্গে Repair যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এতে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, টেকসই পরিবহন ও সবুজ অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, আইকিউএসি পরিচালকের প্রস্তুত করা ফ্রেমওয়ার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে অল্প সময়ের মধ্যে একটি টেকসই গ্রিন ক্যাম্পাসে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মন্তব্য করুন