
বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতের সংস্কার, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং নীতি নির্ধারণে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়ন-সিভিল সোসাইটি অ্যাকশন অ্যালায়েন্স (TUCSAA) নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) বেলা ১১টা ৩০ মিনিট থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্ল্যাটফর্মটির আত্মপ্রকাশ ও নীতিগত ঘোষণাপত্র উন্মোচন করা হয়। এতে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ এবং অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে TUCSAA-এর আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের (বিএলএফ) সাধারণ সম্পাদক শাকিল আখতার চৌধুরী, প্ল্যাটফর্মটির উপদেষ্টা ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের মহিলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসরিন আক্তার দিনা, উপদেষ্টা ও ওয়্যারবী ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ অভিবাসী অধিকার ফোরাম ও বোয়াফের চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দীন খানসহ প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, শুধু কতসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেন—এটি দিয়ে শ্রম অভিবাসন খাতের সাফল্য পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিদেশে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন এবং এ সময়ে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ বিশাল অর্থনৈতিক খাতের নীতি নির্ধারণে শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব থাকা প্রয়োজন বলে মত দেয় সংগঠনটি।
ঘোষণাপত্রে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) ব্যবস্থার পরিবর্তে আইনি বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তি করার দাবি জানানো হয়েছে। এসব চুক্তিতে নিয়োগকর্তাদের দায়বদ্ধতা, শ্রমিকের অধিকার এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সৌদি আরবের শ্রমবাজার ও বিশ্বকাপকে ঘিরে সম্ভাব্য নির্মাণকাজে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ও অনিয়ম, মানবপাচার এবং অভিবাসন ব্যয়ের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসে।
জোটটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত এক বছরে ৪ হাজার ৮৭২ জন বাংলাদেশি মানবপাচারের শিকার হয়েছেন। মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোর শ্রমিকসেবা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেলা পর্যায়ে নেটওয়ার্ক গড়ার উদ্যোগ
TUCSAA-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতে দেশের অভিবাসনপ্রবণ জেলাগুলোতে ‘জেলা ফোরাম’ বা পরামর্শ সভা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের কাছে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হবে।
সরকারের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য তদারকি বা অডিট ব্যবস্থার দাবিও জানানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার ইঙ্গিত
আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এ কর্মসূচি TUCSAA-এর দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ। ভবিষ্যতে শ্রম অভিবাসন খাতের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে নীতিনির্ধারকদের কাছে সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বা লোগো ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যায়নি। একইভাবে সংগঠনটির অর্থায়ন ও বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
শ্রম অভিবাসন খাতের সংস্কার নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাবিগুলো বাস্তবায়নের পথ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে নতুন এই জোট।
মন্তব্য করুন