
গরমের এই মৌসুমে দেশজুড়ে, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার এখন অফ-পিক সময়ের সাধারণ চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। এর প্রভাব ভালোভাবেই পড়েছে বগুড়ার ধুনট উপজেলায়, যেখানে গ্রামেগঞ্জে দিনে-রাতে মিলিয়ে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। এই লোডশেডিং জনজীবন, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত করছে।
ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন ১০টি উপজেলা ও পৌরসভার ২২১টি গ্রামে গ্রাহক সংখ্যা ৯৪ হাজার ১০ জন। এখানে দৈনিক চাহিদা ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে তার অর্ধেক, কখনো কখনো তারও কম। ফলে বিভিন্ন এলাকায় করতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং। গতকাল দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে ধুনট পেয়েছে মাত্র ৮ মেগাওয়াট—চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধানই বলে দেয় সংকটের গভীরতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন থাকবে না—তার কোনো নির্ভরযোগ্য সময়সূচি নেই গ্রাহকদের কাছে। জরুরি সেবা নম্বরে বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও অনেক সময় মেলে না সাড়া। অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকা একজন গ্রাহকের অন্তত সমস্যার কারণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাব্য সময় জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু জনবল-সংকটের অজুহাতে সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন ধুনটের মানুষ।
প্রচণ্ড গরমে এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। কালেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিখন মণ্ডল বলেন, রাতের লোডশেডিংয়ের কারণে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গতকাল রাত ৪টায় বিদ্যুৎ চলে গিয়ে ফিরেছে সকাল দশটায়। বাচ্চাসহ বয়স্কদের অবস্থা গরমে কাহিল হয়ে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যক্রমও।
লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর, আইপিএস কিংবা পর্যাপ্ত আলোর সুযোগ না থাকায় গ্রামের অসংখ্য শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় তৈরি হচ্ছে সরাসরি বৈষম্য। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্টুডিও, স্টেশনারি দোকান, রেস্টুরেন্ট, লাইব্রেরি, চালকল ও বিভিন্ন খামার। লোডশেডিংয়ের আঘাত শুধু ঘরের বাতি নেভানোতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ধীর করে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির গতিও।
উপজেলার চৌকিবাড়ী, মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়নে চিত্র আরও ভয়াবহ। রাতের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের—দুই ঘণ্টা পরপর এসে মাত্র ২০-৩০ মিনিটেই ফের চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ।
তবে অন্যরকম ভোগান্তিতে রয়েছে ১৫টি আইটি ফার্মের অধীনে কর্মরত মথুরাপুরের প্রায় ২০০ জন ফ্রিল্যান্সার।তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। তাদেরই একজন মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, লোডশেডিং আমাদের জন্য শুধু ভোগান্তি নয়, সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ। সময়মতো কাজ ডেলিভারি দিতে না পারলে বিদেশি ক্লায়েন্ট হারানো, অর্ডার বাতিল ও অর্থ ফেরতের ঝুঁকি থাকে।
ভোগান্তির শিকার মুরগি খামারিরাও। চৌকিবাড়ীর পাঁচথুপী গ্রামের খামারি আবু তালেব বলেন, লোডশেডিংয়ে মুরগি নিয়ে খুব বিপদে আছি, ইতিমধ্যে কয়েকটি মুরগি মারা গিয়েছে। চিকাশী, কালেরপাড়া ও ভান্ডারবাড়ীতেও একই চিত্র। গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী গোলাম রাব্বানী জানান, গত এক সপ্তাহে লোডশেডিং ব্যাপক বেড়েছে। ১০ মিনিট কারেন্ট থাকলে এক ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, রাতে সমস্যাটা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে সরাসরি পরদিনের কর্মজীবনে।
ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেদক ডিজিএম মোহাম্মদ কামাল পাশার কক্ষে বসে থাকা অবস্থাতেই একের পর এক ভুক্তভোগী এসে ক্ষোভ জানাচ্ছেন।যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই স্পষ্ট করে তোলে। এ বিষয়ে ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মোঃ কামাল পাশার কাছে জানতে চাইলে তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই কষ্ট শুধু ধুনটে নয়, সারা দেশেই অল্প কিছু বিদ্যুৎ সংকট চলছে। মানুষ ফোন করে, অফিসে এসে যন্ত্রণার কথা জানাচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি বিভিন্ন কারণে অচল হয়ে আছে, কিছুক্ষেত্রে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে।
এই জাতীয় সংকটের কিছু প্রভাব ধুনটের মতো মফস্বল জনপদে পড়েছে।
তাঁর ভাষ্যমতে, জাতীয় পর্যায়ের এই সংকট সমাধান হলেই স্বাভাবিক হবে স্থানীয় সরবরাহ।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন উপজেলাবাসী। পৌর এলাকায় তুলনামূলক স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও গ্রামীণ জনপদে কেন বারবার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
এই প্রশ্নের সদুত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। গ্রাহকদের দাবি, দ্রুত এই সংকট নিরসন করে নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সময়সূচি প্রণয়ন ও ন্যায্য বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি দ্রুত এর সমাধান চান এবং সময়সূচি ও ন্যায্য বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করা হোক।
মন্তব্য করুন