
প্রথম শ্রেণির পৌরসভা, জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ। কিন্তু নাগরিক সেবা দিতে কর্মচারী রয়েছেন মাত্র ২১ জন। ফলে জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে ড্রেন পরিষ্কার, সড়কবাতি মেরামত, নাগরিক সনদ প্রদান প্রতিটি সেবাতেই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সান্তাহার পৌরবাসী।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান জনবল সংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে নাগরিক সেবা কার্যক্রম প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। ১০ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় প্রয়োজনীয় জনবল ৫০ থেকে ৫৫ জন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২১ জন।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই প্রতি মাসে ব্যয় হয় প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া মাসিক বিদ্যুৎ বিল বাবদ গুনতে হয় আরও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সীমিত আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকায় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি সাধারণ আবেদন নিষ্পত্তি করতেও অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সড়কবাতি নষ্ট হলে তা মেরামতে বিলম্ব হয়, ড্রেন পরিষ্কারেও দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। ফলে নাগরিক জীবনের নিত্যদিনের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে। বর্তমানে পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত মেয়র বা জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিলম্ব হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি প্রয়োজন নিয়ে পৌরসভায় গেলেও অনেক সময় তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এদিকে জনবল সংকটের আরেকটি চিত্র ফুটে উঠেছে পৌরসভার প্রকৌশল শাখায়। একমাত্র প্রকৌশলী আবু রায়হানকে একসঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কারিগরি তদারকিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সান্তাহার পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান মিঠু বলেন, “সান্তাহার একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও এখানকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, “পৌরসভার রাজস্ব বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে হাট-বাজার, মৎস্য আড়ত, কোরবানির পশুর হাট ও মার্কেট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে।”
পৌরসভার প্রকৌশলী আবু রায়হান বলেন, “জনপ্রতিনিধি না থাকায় এবং প্রশাসক দূরে অবস্থান করায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নাগরিকদের সেবা দিতে। প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় বাড়ানো গেলে নাগরিক দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে সান্তাহার পৌরবাসীর একটাই প্রত্যাশা দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌরসভাকে একটি আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হোক। অন্যথায় প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা থাকলেও নাগরিক সেবার বাস্তব চিত্র বদলাবে না বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
মন্তব্য করুন