
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) উদ্যোগ নিলে এটিকে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিসেস ইন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি’ শীর্ষক টেকসই প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্যাম্পেইনের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনআইডিও) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) যৌথ উদ্যোগে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুরু করতে পারে, তবে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে পারি যে জাহাঙ্গীরনগরই দেশের প্রথম প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস। এটি সারা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হবে।’
মন্ত্রণালয়ের বিগত ছয় মাসের কার্যক্রম ও সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে আমরা ২ হাজার ৩০০ একরের বেশি দখল হয়ে যাওয়া বনের জায়গা উদ্ধার করে বনায়ন করেছি। আমাদের লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ শতাংশের বেশি গাছ ইতোমধ্যে লাগানো শেষ। এ বছর সরকারি তালিকার অধীনে দুই কোটি ৮৪ লাখের মতো গাছ রোপণ করা হয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের গাছগুলো এর বাইরে। আমাদের লক্ষ্য ২৫ কোটি গাছ লাগানো।’
উপকূলীয় বনায়ন ও কার্বন ক্রেডিট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে উপকূলের চার হাজার ৪০০ একর জায়গায় আরও দুই কোটি কেওড়া গাছ লাগানো হবে। জায়গা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রথম গাছ লাগানো থেকে আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট ফর্মুলা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।’
সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২২ বছরে সুন্দরবনে ২৭ বার আগুন লেগেছে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত কঠোর গাইডলাইন ও বন বিভাগের সতর্কতার কারণে সুন্দরবনে কোনো আগুন লাগেনি। আগামীতে প্লাস্টিক বা বোতলজাত পানি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ওয়েস্ট টু রিসোর্স প্রজেক্টের মাধ্যমে প্লাস্টিক ও পলিথিন রিসাইকেল করে কাঠের বিকল্প তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া পচনশীল হোটেল-বর্জ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত করে প্রতি কেজি ১০ টাকায় জৈব সার তৈরি করে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক মডেল।’
বর্জ্য ও পলিথিনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ফোর আর (রিজেক্ট, রিডিউস, রিসাইকেল, রিইউজ) নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। কাঁচাবাজার ও দৈনন্দিন কাজে সিঙ্গেল ইউজ পলিথিনের দরকার নেই, সেখানে বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। সম্প্রতি সিসামুক্ত বাংলাদেশ আইন ক্যাবিনেটে অনুমোদিত হয়েছে এবং উৎপাদকের বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সম্পর্কিত ইপিআর নিয়ম গেজেট আকারে জারি হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, বুড়িগঙ্গা ও গাজীপুরের বিভিন্ন খালের ওপর বর্জ্য ফেলার বিষয়ে কঠোর তদারকি চলছে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে কর্মকর্তাদের প্রচলিত প্রতিবেদনের বদলে বাস্তবে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সামাজিক নেতৃত্বে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যখন গ্রামে বা নিজ এলাকায় যান, তখন পরিবেশ রক্ষায় ছোট ছোট ক্যাম্পেইন পরিচালনা করুন। তরুণদের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাবে ক্যাম্পাসের সংলগ্ন এলাকায় শব্দদূষণ রোধে নীরব এলাকা ঘোষণা এবং ক্যাম্পাস বর্জ্য সরাতে সিটি করপোরেশনের সহায়তার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান। সমাপনী বক্তব্যে তিনি পরিবেশবান্ধব ও প্লাস্টিকমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ, ইউএনআইডিও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা, জাকসু সদস্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন