
বগুড়ার ধুনট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানসহ প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি বাড়ছে নেপিয়ার ঘাসের চাষ। কম খরচে বারবার ঘাস কাটার সুযোগ এবং স্থানীয় খামারগুলোতে ব্যাপক চাহিদার কারণে অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে নেপিয়ার ও সুপার নেপিয়ার চাষ করছেন। এতে একদিকে কৃষকের বাড়তি আয় হচ্ছে, অন্যদিকে খামারিদের গবাদিপশুর কাঁচা খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হচ্ছে।
উপজেলার পাঁচথুপী গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ খাদেমের জীবনেও এই ঘাস চাষ এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালানো খাদেম বর্তমানে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে নেপিয়ার ও সুপার নেপিয়ার চাষ করছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ঘাস চাষের আয় দিয়ে জমি কেনা, বাড়ি নির্মাণসহ সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন তিনি।
খাদেম জানান, প্রায় ১০-১২ বছর আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে নেপিয়ার ঘাসের কাটিং সংগ্রহ করে বর্গা জমিতে চাষ শুরু করেন। অন্যান্য ফসলের তুলনায় এ চাষে খরচ কম। একবার চারা রোপণ করার পর নির্দিষ্ট সময় পরপর ঘাস কেটে বিক্রি করা যায়।
তিনি বলেন, “এক বিঘা জমি থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকার ঘাস বিক্রি করা সম্ভব। অনেক সময় খামারিরাই জমি থেকে ঘাস নিয়ে যান। আবার আমি নিজেও বিভিন্ন খামারে ঘাস পৌঁছে দিই।”
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত ৪০-৪৫ দিন পরপর নেপিয়ার ঘাস কাটা যায়। বছরে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। সামান্য সার ও পরিচর্যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় একই জমি থেকে উৎপাদন নেওয়া যায়। ফলে ধান বা অন্যান্য মৌসুমি ফসলের তুলনায় অনেক কৃষকের কাছে এটি তুলনামূলক লাভজনক বলে মনে হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার চৌকিবাড়ি, কালেরপাড়া, চিকাশী, নিমগাছি ও গোপালনগরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষিজমির পাশাপাশি রাস্তার পাশ, পুকুরের পাড়, জমির আইল ও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতেও নেপিয়ার ঘাসের চাষ করা হচ্ছে। কেউ জমি থেকে ঘাস কেটে ভ্যান বা ভটভটিতে করে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ সরাসরি খামারিদের কাছে সরবরাহ করছেন।
গোপালনগরের ঘাসচাষি মোহাম্মদ শামীম বলেন, নেপিয়ার চাষে কীটনাশকের প্রয়োজন খুব কম এবং সেচ ও পরিচর্যা ব্যয়ও তুলনামূলক কম। একবার রোপণ করার পর একই জমি থেকে পরবর্তী দুই বছর, অনুকূল পরিস্থিতিতে তিন বছর পর্যন্ত ঘাস সংগ্রহ করা যায়।
তাঁর হিসাবে, এক বিঘা জমি থেকে প্রতি দেড় মাসে প্রায় তিন হাজার আঁটি ঘাস পাওয়া যায়। প্রতি আঁটি ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হলে একবারের বিক্রিতে ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। বছরে পাঁচ-ছয়বার ঘাস কাটার সুযোগ থাকায় মোট আয়ও উল্লেখযোগ্য হয়। তবে জমি, শ্রম ও বাজারভেদে উৎপাদন খরচ ও লাভের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
মথুরাপুর ইউনিয়নের কৃষক রাসেল জানান, আগে গবাদিপশুর খাবারের জন্য বাজার থেকে ভুসি ও খৈলসহ বিভিন্ন খাদ্য কিনতে হতো। নেপিয়ার ঘাস চাষ শুরু করার পর গরুর খাদ্য বাবদ তাঁর ব্যয় অনেকটাই কমেছে। একই সঙ্গে গাভীর দুধ উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন বলে জানান তিনি।
আরেক কৃষক ও খামারি আবুল কালাম বলেন, পাঁচটি গরুর জন্য প্রতিদিন বাজার থেকে ঘাস কিনতে হতো। এখন ১০ শতক জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে নিজের গরুর খাদ্যের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘাস বিক্রি করতে পারছেন।
মথুরাপুর ইউনিয়নের কৃষক বিল্লাল হোসেনও নিজের গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য নেপিয়ার চাষ করছেন। পশুর চাহিদা পূরণের পর অবশিষ্ট ঘাস বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন তিনি।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, নেপিয়ার ঘাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—একবার জমিতে চারা লাগানোর পর দীর্ঘ সময় ধরে সেখান থেকে উৎপাদন নেওয়া যায়। ধান বা অন্যান্য ফসলের মতো প্রতি মৌসুমে নতুন করে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের প্রয়োজন হয় না। এতে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমে আসে। একই সঙ্গে খামারিদের কাছেও সারা বছর সবুজ ঘাসের চাহিদা থাকায় বাজার পাওয়া তুলনামূলক সহজ।
প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টদের মতে, নেপিয়ার গবাদিপশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সবুজ খাদ্য। প্রাকৃতিক চারণভূমি কমে যাওয়ায় অনেক খামারকেই বাজারনির্ভর খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। নেপিয়ার চাষ বাড়ায় খামারিরা নিজেদের জমি থেকেই কাঁচা ঘাসের একটি বড় অংশ সংগ্রহ করতে পারছেন।
শরামবাড়ী দারুল হুদা কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও খামারি মাওলানা মহিবুল্লাহ শাফি বলেন, ডেইরি খাতের জন্য উন্নত জাতের সবুজ ঘাসের উৎপাদন বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের মধ্যে নেপিয়ার ঘাসের কাটিং সহজলভ্য করা গেলে এর চাষ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ধুনট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোসাম্মাৎ রেহেনা খাতুন বলেন, প্রাকৃতিকভাবে গবাদিপশুর চারণভূমি কমে যাওয়ায় সবুজ ঘাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। নেপিয়ার চাষ সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, নিয়মিত কাঁচা ঘাস সরবরাহ করা গেলে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ধুনটের ১০টি ইউনিয়নে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার গরুর খামার রয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের বাড়িতে দুই লাখের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। ফলে এসব পশুর খাদ্য চাহিদা পূরণে সবুজ ঘাসের বাজারও বড় হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ধুনট উপজেলায় ৩০১ হেক্টর জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ ও খামারিদের চাহিদা অব্যাহত থাকলে এ আবাদ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কৃষকদের জন্য তুলনামূলক কম বিনিয়োগে দীর্ঘ সময় আয় এবং খামারিদের জন্য সহজলভ্য সবুজ খাদ্যের সুযোগ—এই দুই দিক মিলিয়ে ধুনটে নেপিয়ার ঘাস এখন শুধু পশুখাদ্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক ফসল হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে।
মন্তব্য করুন