হাসান মাহমুদ জয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভূরুঙ্গামারীর তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে হরিলুট, প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ

Share this news with

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—কিন্তু সেই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগরদের নিঃস্ব করার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র ভেসে উঠেছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান এবং শিক্ষকদের ওপর একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে চাকরি ও এমপিওভুক্তির ভুয়া আশ্বাসের বেড়াজালে এক শিক্ষককে সর্বস্বান্ত করার ঘটনায় এলাকজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এসব দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রতিকার ও বিচার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলমকে সহকারী শিক্ষক (গণিত) পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত ও বেতন নিশ্চিত করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক তার নিকট থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করেন। সংসার ও পৈতৃক সম্বল বিসর্জন দিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মাঝেও সেই টাকা পরিশোধ করেন ওই শিক্ষক। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের চরম প্রশাসনিক অদক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্যাটার্ন জটিলতার অজুহাতে ফাইল বারবার বাতিল হতে থাকে। পরবর্তীতে তাকে পুনরায় জোরপূর্বক ভৌত বিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগের প্রহসনে ফেলা হয়।

দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিনা বেতনে তিল তিল করে পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার পর, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক আবুল হোসেন অবসর গ্রহণ করেন। ফলে ওই পদটি শূন্য হলেও ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলমকে সেখানে আবেদনের ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া হয়নি। উল্টো প্রধান শিক্ষক গোপনে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষক চেয়ে চাহিদা পাঠিয়ে দেন। বকেয়া টাকা ফেরত চাইলে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন টালবাহানা, ভিত্তিহীন মন্তব্য ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কালক্ষেপণ শুরু করেন। এতে শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম আজ ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা এক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (বাংলা) সেলিনা খাতুন দীর্ঘকাল ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষকের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর দেখিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে যাচ্ছেন। তার বদলি হিসেবে ‘নিপা পারভীন’ নামের এক ব্যক্তিকে প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে বসানো হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলা বিষয়ের শিক্ষক না হয়েও ওই প্রক্সি শিক্ষককে ইংরেজি ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার পরিবেশকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বৈধ ও নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি না থাকায় প্রধান শিক্ষক একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আয়-ব্যয়ের মনগড়া হিসাব দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন। বিদ্যালয়ের তহবিল বা নিজেদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বললেই প্রধান শিক্ষক ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষকদের বিনা কারণে শোকজ, চাকরিচ্যুত করার হুমকি ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে গোটা প্রতিষ্ঠানে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

এদিকে বিদ্যালয়ের একজন আজীবন দাতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি অতীতে বিদ্যালয়ের উন্নয়নে নগদ ২ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেছেন। অথচ বিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ডে দাতার নাম থাকার কথা থাকলেও তা রাখা হয়নি। বিদ্যালয়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাকে জানানো তো দূরের কথা, একজন আজীবন দাতা হিসেবে তাকে ন্যূনতম কোনো সম্মান বা মূল্যায়নও করা হয় না।

সার্বিক বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত নির্বিকারভাবে স্বীকার করেন যে, ওই শিক্ষকের কাছ থেকে নিয়োগ বাবদ ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল—যা মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে! প্রক্সি শিক্ষকের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, প্রক্সি শিক্ষক বেশ ভালো ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়া সহকারী শিক্ষক সেলিনা খাতুন অসুস্থ এবং তার বেতন ইএফটি (EFT)-এর মাধ্যমে হয় বিধায় এ বিষয়ে নিজের কোনো হাত নেই বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও কোনো গরমিল নেই বলে দাবি করেন এই প্রধান শিক্ষক।

ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন কণ্ঠে জানান, “প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসা মাত্রই দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চকবাজারে মুনসুর খান টাওয়ারে আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা

১

বগুড়ায় মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার তাগিদ

২

নন্দীগ্রামে তথ্য সংগ্রহ অবহিতকরণ ও কন্যা শিশু দিবসে আলোচনা

৩

পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে শাহজাহানপুরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের সৌন্দর্যবর্ধন শুরু

৪

পুরান ঢাকার চকবাজারে মার্কেটে আগুন, নেভাতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

৫

বগুড়ায় ৩০ গ্রাম গাঁজাসহ ৩ জন গ্রেফতার, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ দিনের কারাদণ্ড

৬

সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থী

৭

আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার ছাড়াই চালকল পরিচালনা, সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তে মিলল সত্যতা

৮

ধুনটে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও সোনার চেইন ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৪

৯

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান ফটক থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দিল পুলিশ

১০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হলে জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট

১১

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৪০ বছর করার দাবি, নিয়োগে স্বচ্ছতা চান চাকরিপ্রত্যাশীরা

১২

তেজগাঁও কলেজ শিক্ষার্থী রানা হত্যার বিচারের দাবিতে সেজান পয়েন্টে অবস্থান

১৩

সীমান্তে পুশ-ইন চেষ্টা পণ্ড: ৪ ভারতীয় নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো বিএসএফ

১৪

গোবিপ্রবিতে আল-কুরআন ক্লাবের সিরাত প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত

১৫

মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ, কুশপুত্তলিকা দাহ

১৬

বগুড়ায় বিশ্ব নদী দিবসের মানববন্ধন: করতোয়া নদীর দখল প্রতিরোধে একাট্টা পরিবেশ আন্দোলন

১৭

বন্ধ চিনিকল, বেকার শ্রমিক: জগতি চালুর দাবিতে কুষ্টিয়ায় প্রতিবাদ সমাবেশ

১৮

কলকাতায় মারা গেলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটন, মরদেহ ঢাকায় আনার প্রস্তুতি

১৯

নাগেশ্বরীতে মাদ্রাসার নিয়োগে ১৬ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ, তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

২০