
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—কিন্তু সেই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগরদের নিঃস্ব করার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র ভেসে উঠেছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান এবং শিক্ষকদের ওপর একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে চাকরি ও এমপিওভুক্তির ভুয়া আশ্বাসের বেড়াজালে এক শিক্ষককে সর্বস্বান্ত করার ঘটনায় এলাকজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এসব দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রতিকার ও বিচার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলমকে সহকারী শিক্ষক (গণিত) পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত ও বেতন নিশ্চিত করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক তার নিকট থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করেন। সংসার ও পৈতৃক সম্বল বিসর্জন দিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মাঝেও সেই টাকা পরিশোধ করেন ওই শিক্ষক। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের চরম প্রশাসনিক অদক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্যাটার্ন জটিলতার অজুহাতে ফাইল বারবার বাতিল হতে থাকে। পরবর্তীতে তাকে পুনরায় জোরপূর্বক ভৌত বিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগের প্রহসনে ফেলা হয়।
দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিনা বেতনে তিল তিল করে পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার পর, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক আবুল হোসেন অবসর গ্রহণ করেন। ফলে ওই পদটি শূন্য হলেও ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলমকে সেখানে আবেদনের ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া হয়নি। উল্টো প্রধান শিক্ষক গোপনে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষক চেয়ে চাহিদা পাঠিয়ে দেন। বকেয়া টাকা ফেরত চাইলে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন টালবাহানা, ভিত্তিহীন মন্তব্য ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কালক্ষেপণ শুরু করেন। এতে শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম আজ ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা এক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (বাংলা) সেলিনা খাতুন দীর্ঘকাল ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষকের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর দেখিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে যাচ্ছেন। তার বদলি হিসেবে ‘নিপা পারভীন’ নামের এক ব্যক্তিকে প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে বসানো হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলা বিষয়ের শিক্ষক না হয়েও ওই প্রক্সি শিক্ষককে ইংরেজি ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার পরিবেশকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বৈধ ও নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি না থাকায় প্রধান শিক্ষক একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আয়-ব্যয়ের মনগড়া হিসাব দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন। বিদ্যালয়ের তহবিল বা নিজেদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বললেই প্রধান শিক্ষক ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষকদের বিনা কারণে শোকজ, চাকরিচ্যুত করার হুমকি ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে গোটা প্রতিষ্ঠানে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের একজন আজীবন দাতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি অতীতে বিদ্যালয়ের উন্নয়নে নগদ ২ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেছেন। অথচ বিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ডে দাতার নাম থাকার কথা থাকলেও তা রাখা হয়নি। বিদ্যালয়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাকে জানানো তো দূরের কথা, একজন আজীবন দাতা হিসেবে তাকে ন্যূনতম কোনো সম্মান বা মূল্যায়নও করা হয় না।
সার্বিক বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত নির্বিকারভাবে স্বীকার করেন যে, ওই শিক্ষকের কাছ থেকে নিয়োগ বাবদ ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল—যা মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে! প্রক্সি শিক্ষকের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, প্রক্সি শিক্ষক বেশ ভালো ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়া সহকারী শিক্ষক সেলিনা খাতুন অসুস্থ এবং তার বেতন ইএফটি (EFT)-এর মাধ্যমে হয় বিধায় এ বিষয়ে নিজের কোনো হাত নেই বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও কোনো গরমিল নেই বলে দাবি করেন এই প্রধান শিক্ষক।
ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন কণ্ঠে জানান, “প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসা মাত্রই দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মন্তব্য করুন