এলিন মাহবুব, কলামিস্ট
১ জুন ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভিশন জিরো : ঈদের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশের নতুন পথ

Share this news with

প্রতি বছর ঈদ এলেই বাংলাদেশের সড়ক এক ধরনের অঘোষিত যুদ্ধে পরিণত হয়। মানুষ ঘরে ফেরে আনন্দ নিয়ে, কিন্তু অনেক পরিবার ফিরে পায় শূন্যতা। কোথাও বাস নিয়ন্ত্রণ হারায়, কোথাও ট্রাকের চাপায় প্রাণ হারায় যাত্রী, আবার কোথাও অতিরিক্ত গতির কারণে থেমে যায় একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ। ঈদের এই মৃত্যুচিত্র এখন যেন স্বাভাবিক সংবাদে পরিণত হয়েছে যা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ।

প্রশ্ন হলো আমরা কি এই মৃত্যুকে সত্যিই “দুর্ঘটনা” বলে মেনে নেব, নাকি এটি একটি ভাঙা ব্যবস্থার ফল হিসেবে দেখব?

বিশ্বের অনেক দেশ এখন সড়ক মৃত্যুকে আর “অপরিহার্য” হিসেবে দেখে না। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও কার্যকর মডেল হলো সুইডেনের ভিশন জিরো। এই নীতির মূল দর্শন অত্যন্ত বিপ্লবী“শূন্য মৃত্যু কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।”

ভিশন জিরো এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এখানে দোষ শুধু চালকের নয়, পথচারীর নয় বরং পুরো সিস্টেমের। রাস্তার ডিজাইন, গাড়ির নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করে একজন মানুষ বাঁচবে নাকি মারা যাবে।

বাংলাদেশের ঈদকালীন সড়ক বাস্তবতায় এই দর্শন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের এখানে দুর্ঘটনা কোনো একক কারণে ঘটে না; বরং একাধিক ব্যর্থতা একসাথে কাজ করে। অতিরিক্ত যাত্রীবহন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতা সব মিলিয়ে সড়ক এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমে পরিণত হয়।

ভিশন জিরো যদি বাংলাদেশে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে প্রথমেই প্রয়োজন “দোষারোপ সংস্কৃতি” থেকে বের হয়ে “নিরাপত্তা নকশা সংস্কৃতি”-তে প্রবেশ করা। অর্থাৎ, মানুষ ভুল করবে—এটা স্বাভাবিক ধরে নিয়েই এমন সিস্টেম তৈরি করতে হবে, যেখানে সেই ভুল মৃত্যুর কারণ হবে না।

ঈদ মৌসুমে এই নীতির কিছু বাস্তবসম্মত প্রয়োগ হতে পারে গতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শহর ও মহাসড়কে স্পিড ম্যানেজমেন্ট কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অধিকাংশ প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি।গাড়ির ফিটনেস ও চালকের সক্ষমতা যাচাইকে কঠোর করতে হবে। ঈদের সময় যেকোনো যানবাহন সড়কে নামার আগে বাধ্যতামূলক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং চালকের বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি।ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা চিহ্নিত করে অস্থায়ীভাবে হলেও নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। যেমন স্পিড ব্রেকার, বিভক্ত লেন, এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা।

আইন প্রয়োগকে মৌসুমি নয়, ধারাবাহিক করতে হবে। ঈদের সময় কঠোরতা দেখিয়ে পরে শিথিল হয়ে গেলে কোনো পরিবর্তন স্থায়ী হয় না।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতা পরিবর্তন। আমরা এখনো সড়ক নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখি। কিন্তু ভিশন জিরো আমাদের শেখায়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় নৈতিক প্রতিশ্রুতি।

একটি উন্নয়নশীল দেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো অগ্রগতির পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুকে স্বাভাবিক করে ফেলা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো আমাদের সক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু সেই অবকাঠামো যদি মানুষের জীবন নিরাপদ না করে, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হবে, যখন ঘরে ফেরা যাত্রা আর অনিশ্চয়তার গল্প হবে না। যখন একটি পরিবার নিশ্চিতভাবে জানবে তাদের প্রিয়জন নিরাপদে ফিরে আসবে।ভিশন জিরো কোনো বিদেশি ধারণা নয় এটি একটি মানবিক ঘোষণা: “একটি জীবনও হারানো উচিত নয়, যদি তা প্রতিরোধ করা যায়।”

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারীরা কথা বলবেন, কিন্তু নিরাপদ থাকবেন তো?

১

নিয়োগপত্রের দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে ৮৩ প্রার্থীর আমরণ অনশন

২

চকবাজারে মুনসুর খান টাওয়ারে আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা

৩

বগুড়ায় মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার তাগিদ

৪

নন্দীগ্রামে তথ্য সংগ্রহ অবহিতকরণ ও কন্যা শিশু দিবসে আলোচনা

৫

পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে শাহজাহানপুরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের সৌন্দর্যবর্ধন শুরু

৬

পুরান ঢাকার চকবাজারে মার্কেটে আগুন, নেভাতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

৭

বগুড়ায় ৩০ গ্রাম গাঁজাসহ ৩ জন গ্রেফতার, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ দিনের কারাদণ্ড

৮

সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থী

৯

আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার ছাড়াই চালকল পরিচালনা, সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তে মিলল সত্যতা

১০

ধুনটে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও সোনার চেইন ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৪

১১

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান ফটক থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দিল পুলিশ

১২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হলে জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট

১৩

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৪০ বছর করার দাবি, নিয়োগে স্বচ্ছতা চান চাকরিপ্রত্যাশীরা

১৪

তেজগাঁও কলেজ শিক্ষার্থী রানা হত্যার বিচারের দাবিতে সেজান পয়েন্টে অবস্থান

১৫

সীমান্তে পুশ-ইন চেষ্টা পণ্ড: ৪ ভারতীয় নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো বিএসএফ

১৬

গোবিপ্রবিতে আল-কুরআন ক্লাবের সিরাত প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত

১৭

মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ, কুশপুত্তলিকা দাহ

১৮

বগুড়ায় বিশ্ব নদী দিবসের মানববন্ধন: করতোয়া নদীর দখল প্রতিরোধে একাট্টা পরিবেশ আন্দোলন

১৯

বন্ধ চিনিকল, বেকার শ্রমিক: জগতি চালুর দাবিতে কুষ্টিয়ায় প্রতিবাদ সমাবেশ

২০