
বান্দরবান পার্বত্য জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলার ৪৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৪৪টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের ২ হাজার ৩৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৬১টি পদও শূন্য।
ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান সদর উপজেলার ৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। রুমায় ৬৮টির মধ্যে ৫৪টি, রোয়াংছড়িতে ৬২টির মধ্যে ৪১টি, থানচিতে ৩৮টির মধ্যে ৩২টি, লামায় ৮৫টির মধ্যে ৩৫টি, নাইক্ষ্যংছড়িতে ৫৬টির মধ্যে ৩৩টি এবং আলীকদমে ৫০টির মধ্যে ৩৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।
এর মধ্যে রুমা উপজেলায় সংকট সবচেয়ে বেশি। উপজেলার ৬৮টি বিদ্যালয়ের ৫৪টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে তাঁদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হচ্ছে। অন্য শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে।
রোয়াংছড়ির একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মং প্রু মার্মা বলেন, “প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদেরই প্রধান শিক্ষকের দাপ্তরিক কাজ করতে হয়। এতে পাঠদানের সময় কমে যায়। পাশাপাশি অন্য শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয়। ফলে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
আলীকদম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সামশুল আলম বলেন, উপজেলার ৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সহকারী শিক্ষকেরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, “নৌকার মাঝি না থাকলে যেমন নৌকা সঠিকভাবে চলতে পারে না, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলেও তেমনই সমস্যা হয়। বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা করুণ।”
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে দপ্তরির পদও শূন্য রয়েছে। ফলে বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ঘণ্টা বাজানোসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজও শিক্ষকদের করতে হচ্ছে। এতে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট সবচেয়ে তীব্র বলে জানা গেছে।
স্থানীয় অভিভাবকেরা দ্রুত শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন। আলীকদমের অভিভাবক উক্যচিং মারমা ও সুমন ত্রিপুরা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়তে পারে। তাই দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) পরিণয় চাকমা বলেন, সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। তবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পদোন্নতি এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিধান থাকলেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের এখতিয়ার জেলা পরিষদের নেই। বিষয়টি জেলা পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল মনসুর বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগটি জেলা পরিষদের ন্যস্ত বিভাগ। ইতোমধ্যে ৪২টি সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা পরিষদের নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ পদে নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে হয়ে থাকে। শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
১৯৮৬ সালে বান্দরবানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২১৯টি। এরপর প্রায় চার দশকে আরও ২১৬টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও সে অনুযায়ী শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা বাড়েনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
মন্তব্য করুন