
বর্ষার পানিতে বগুড়ার ধুনট উপজেলার মাঠ-ঘাট, খাল-বিল ও বিভিন্ন জলাশয় থইথই করছে। অতিবৃষ্টিতে অনেক পুকুরের ছোট পোনা ও রেণু মাছ ভেসে খাল-বিল ও আশপাশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকার করছেন জেলেসহ এক শ্রেণির শিকারি।
ক্ষুদ্র ফাঁসবিশিষ্ট এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছের পাশাপাশি মাছের ডিম, রেণু ও পোনা মাছও আটকা পড়ছে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান চললেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
মৎস্য অফিস, জেলে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার একটি চক্র বাজার থেকে চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল কিনে বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে অবাধে মাছ শিকার করছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেক জেলে ও মাছ শিকারি এসব জাল জলাশয়ে পেতে রাখেন। ফলে ছোট-বড় মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও নির্বিচারে ধরা পড়ছে।
চায়না দুয়ারি জাল সাধারণত এক থেকে দেড় ফুট প্রস্থ এবং ৪০ থেকে ৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের ক্ষুদ্র ফাঁসবিশিষ্ট জাল। লোহার রিং ব্যবহার করে ঢোলক ও চতুর্ভুজ আকৃতিতে তৈরি এসব জালে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০টি খোপ থাকে। বিশেষ কৌশলে জালের দুই প্রান্ত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ের তলদেশে পেতে রাখা হয়।
লোহার কাঠামোর কারণে জালটি পানির একেবারে তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে ছোট থেকে বড়—সব ধরনের মাছ সহজেই জালের ভেতরে প্রবেশ করে আটকা পড়ে। এ জালে মাছের ডিম, ক্ষুদ্র পোনা, শামুক-ঝিনুক, জলজ পোকামাকড় ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদও উঠে আসে এবং অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যায়। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার মথুরাপুর, চৌকিবাড়ী, গোপালনগর, চিকাশী, কালেরপাড়া, নিমগাছী, গোসাইবাড়ী ও এলাঙ্গী ইউনিয়নের বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রতিনিয়ত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের দীঘলকান্দি গ্রাম দিয়ে প্রবাহিত ইছামতী নদীতেও।
শুধু খাল-বিল ও জলাশয়েই নয়, উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ জাল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করলেও চায়না দুয়ারি জাল বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ধুনট বাজার থেকে ৩০০ মিটার কারেন্ট জাল ও একটি চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। এ সময় অবৈধ জাল বিক্রির দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার জলাশয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। জব্দ করা জালগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অভিযানের ধারাবাহিকতায় মথুরাপুর ইউনিয়নের জোলাগাতি ও কাশিহাটা এলাকার বিভিন্ন জলাশয়ে অভিযান চালিয়ে আরও ৪৮টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল আটক করে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব জালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এ প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে কয়েকজন জালের মালিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জালের মালিক জানান, তিনি নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকারকে কোনো অপরাধ হিসেবে মনে করেন না।
অথচ প্রচলিত মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, নিষিদ্ধ চায়না জাল ব্যবহার ও অবৈধ মৎস্য আহরণের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর আওতায় ঘটনাস্থলেই অবৈধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক জরিমানা আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ ক্রেতারা বাজারে গিয়ে দেশীয় কৈ, ট্যাংরা, খলিশা ও পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেখে উৎসাহিত হলেও এসব মাছ কীভাবে ধরা হচ্ছে, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষিদ্ধ জালে ধরা ছোট মাছ ও পোনা কেনার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা দেশীয় মাছের প্রজনন ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে।
এলাকার প্রবীণ জেলেরা জানান, চায়না দুয়ারি জালে একসঙ্গে সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক স্থানীয় মাছ শিকারি ক্রমেই এ জালের দিকে ঝুঁকছেন। এতে চিরাচরিত ভেসাল ও ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের দাবি, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
ধুনট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আরিফ আহমেদ বলেন, “মৎস্য আইনে বেড় জাল ব্যবহারে সর্বনিম্ন এক বছর ও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনার চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকট ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিতভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও সাধ্যমতো চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
স্থানীয় জেলে ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, মৎস্য অফিস ও প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি এবং ধারাবাহিক অভিযান না হলে নিষিদ্ধ চায়না ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হবে। এভাবে নির্বিচারে মাছ শিকার চলতে থাকলে অচিরেই ধুনট এলাকার দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন