
দেশের সর্বদক্ষিণের উপকূলীয় জনপদ ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটা। এটি এখন কেবল ভ্রমণ দর্শনীয় স্থান নয়, এটি দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নৈসর্গিকতা আজ কুয়াকাটাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছে। এছাড়া ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে কুয়াকাটা ঘিরে গড়ে উঠছে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার।
“তবে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতায় এই সম্ভাবনার পূর্ণতা না পাওয়ায়, কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দ্রুত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ‘একক প্রশাসনিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন আগত পর্যটক, স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।”
বঙ্গোপসাগরের সুনীল অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে সরকার ইতোমধ্যে ‘পায়রা-কুয়াকাটা কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান ফোকাসিং অন ইকো-ট্যুরিজম’ প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। সরকার দক্ষিনাঞ্চলকে ‘ইকোনমিক লজিস্টিক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটা পরিনত হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরীতে। আগামীর দক্ষিনাঞ্চল তথা দেশের অর্থনীতিতে মহা সম্ভাবনার দ্বার খুলবে এমনটাই প্রত্যাশা আঞ্চলিক মহলের।

স্থানীয় পেশাজীবী ও সচেতন মহল মনে করছেন, এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র দাপ্তরিক নথিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে এটি দক্ষিনাঞ্চলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগোপযোগী বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষমতা রাখবে। তাই সরকারকে এই মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অপরদিকে পর্যটকদের সেবার মানোন্নয়ন, সৈকতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো মোটেও যথেষ্ট নয় বলে জোড়ালো মত রয়েছে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের। তারা দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছে যে কুয়াকাটাকে কক্সবাজারের আদলে পর্যটন ভিত্তিক একটি পৃথক জেলা, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা অথবা একটি ‘একক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের’ আওতায় আনা হোক। কিন্তু বর্তমান সরকারি ব্যবস্থায় বহুমুখী তদারকির অভাবে পর্যটন নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ ব্যাহত হচ্ছে এবং এতে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন শিল্পের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে দ্রুত একটি ‘একক প্রশাসনিক বলয়’ গঠনে সরকারের বিশেষ আন্তরিকতাই পারে কুয়াকাটা পর্যটনের মহা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে।
এছাড়াও কুয়াকাটার বিশাল সমুদ্রতীর বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম ঝুঁকির সম্মুখীন রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীব্র ঢেউয়ের ঝাপটায় তীরের বালুক্ষয় ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংস এবং সংরক্ষিত বনের উপকার ভোগীদের নির্বিচারে বন নিধন এই উপকূলকে গত কয়েকদশকে একে একে বিপন্ন করে তুলেছে। গত ৩ দশকের ব্যবধানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার বনভূমি সমুদ্র তলদেশে হারিয়ে গেছে। এই তীব্র বিপন্ন প্রতিবেশে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অদ্যাবধি টনক নড়েনি পরিবেশবাদী সংস্থা কিংবা সরকারের কোনো মহলের। কুয়াকাটা উপকূলের পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছেছে। এখনই উপকূলীয় সুরক্ষা বেষ্টনী বা বনায়ন সৃজন এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না যায়, তবে সরকার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তা বাস্তবায়নে আর আলোর মুখ দেখবে না বলে এমন প্রতিক্রিয়া আরও জোড়ালো হচ্ছে স্থানীয় মহলে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের কেএম বাচ্চুর মতে, কুয়াকাটার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ জোর দিতে হবে এবং পরিকল্পিত উপকূলীয় সুরক্ষা নীতি গ্রহণ না করলে অচিরেই কুয়াকাটার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও কুয়াকাটার সমুদ্র ঘেষা বেড়ীবাঁধের কিছু পয়েন্টে এখন দৃশ্যমান ঝুঁকির মুখে পতিত হয়েছে।
বিশেষ করে কুয়াকাটার আঞ্চলিক অর্থনীতিকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সাথে যুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত বিনিয়োগ। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটা কেবল স্থানীয় নয়, এটি জাতীয় রাজস্ব খাতেও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তবেই দক্ষিনাঞ্চলকে ‘ইকোনমিক লজিস্টিক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন দ্রুত কার্যকর হবে বলে অভিমত স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও পরিবেশ কর্মীদের।
সাগরকন্যা কুয়াকাটার আধুনিকায়ন শুধু স্থানীয় দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে বাস্তবতার নিরিখে এখন সময়ের জোর দাবিতে পরিনত হয়েছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানান, পরিবেশ ও পর্যটন খাতের টেকসই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে প্রশাসন। উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার উপরে জোর দিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে স্বল্প সময়ে পরিণত বন তৈরির জাপানি কৌশল অনুসরণ করে জেলার কলাপাড়া উপজেলায় বেদখল হওয়া খাস জমি উদ্ধার করে ‘মিয়াওয়াকি ফরেস্ট’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা ও পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে কুয়াকাটা সংলগ্ন ৭টি উপজেলাকে কেন্দ্র করে ‘পায়রা-কুয়াকাটা কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান ফোকাসিং অন ইকো-ট্যুরিজম’ গ্রহণ করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় সরকার ইতিমধ্যে ‘অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’-এর ঘোষণা দিয়েছেন।
কুয়াকাটা উপকূল রক্ষার বিষয়ে পটুয়াখালী (০৪) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ৭’শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবিষয়ে সরকারকে মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
আজ পর্যটন নগরী কুয়াকাটার প্রতিটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রগতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ নগরী গড়ে তুলতে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিনয়ের সাথে আহবান জানিয়েছে দক্ষিণের উপকূলের সর্বস্তরের মানুষ।
তাদের ভাষ্যমতে, সরকারের দূরদর্শী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই কুয়াকাটা হয়ে উঠতে পারে আগামীর আধুনিক বাংলাদেশের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক পর্যটনের মডেল নগরী।
মন্তব্য করুন