
রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে তরুণ সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, গণভোটের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত এলে সেটিকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই; জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে খুলনা প্রেসক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আয়োজিত যুব সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খুলনা মহানগর জামায়াতের যুব ও ক্রীড়া বিভাগের উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু রাজনৈতিক দল কিংবা সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তরুণদেরও পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে দুটির ফলাফলকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একটি গ্রহণ করে অন্যটি প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিসংগত নয়। তাঁর দাবি, গণভোটের রায়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক পদে নিয়োগ এবং সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়গুলোতে সংস্কারের পথ তৈরি হয়েছে।
বিএনপির প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও গণভোটের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর করার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।
সম্মেলনে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর ভাষায়, নতুন বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ভিন্নমতের মানুষের ওপর হামলার সংস্কৃতি থাকা উচিত নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মাদক, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। খুলনার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী তরুণদের কার্যক্রমের প্রশংসা করে এ ধরনের উদ্যোগ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তবে ক্ষতিকর ও অনৈতিক কনটেন্টের প্রতি আসক্তি তরুণদের ভবিষ্যৎ ও চরিত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘাতে জড়ানোর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে একই ধরনের দখলদারি ও হামলার রাজনীতি ফিরে এলে শুধু সংগঠনের নাম পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন হবে না। এমন পরিস্থিতি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থায় দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর দাবি, এ ধরনের নিয়োগের মাধ্যমে ঠিকাদারি, টেন্ডার ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খুলনা বিভাগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্য কারও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, মহানগর জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি বলেন, পাড়া-মহল্লায় যুব কমিটি গড়ে তুলে তরুণদের সংগঠিত করতে হবে। চাঁদাবাজি, মাদক, সন্ত্রাস ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বহু মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। সেই পরিবর্তনের জায়গায় যদি আবার দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দমন-পীড়ন ফিরে আসে, তাহলে সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হবে না।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার আহ্বান জানান। কোরআন পাঠ, চরিত্র গঠন এবং অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ভুল করা ব্যক্তিকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। সংগঠনের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর জামায়াতের যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি মুকাররম আনসারী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা মহানগর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপি, কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সদস্য মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি মো. রাকিব হাসান।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন খুলনা মহানগর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সেক্রেটারি মো. হামিদুল ইসলাম খান। এছাড়া মহানগরের বিভিন্ন থানার নেতাকর্মীরাও বক্তব্য দেন।
সম্মেলন শেষে খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফেরিঘাট মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
মন্তব্য করুন