
শহরে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক বাতি। কিন্তু বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সূর্য ডোবার পরই শুরু হয় অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই। বিদ্যুতের লাইন না থাকায় শত শত গ্রামের মানুষকে এখনো নির্ভর করতে হয় কুপি, মোমবাতি কিংবা ছোট সৌরবাতির ওপর।
সাঙ্গু নদীর তীরে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের চিত্রটি এরই একটি উদাহরণ। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে পুরো জনপদ ডুবে যায় অন্ধকারে। একটি ছোট ঘরে মোমবাতির ম্লান আলোয় বই নিয়ে বসে পড়াশোনা করে রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শৈলিপ্রু মারমা।
শৈলিপ্রু বলে, “ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের গ্রামে বিদ্যুতের আলো দেখিনি। প্রতিদিন মোমবাতি ও কুপির আলোয় পড়াশোনা করতে হয়। বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় স্কুলের ডিজিটাল ক্লাস থেকেও আমরা বঞ্চিত।”
শুধু শৈলিপ্রু নয়, রেমাক্রীসহ জেলার দুর্গম এলাকার হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের বাস্তবতা এমনই। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অনলাইন শিক্ষা, কম্পিউটার ব্যবহার ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সুযোগ থেকেও তারা পিছিয়ে রয়েছে।
প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা রেমাক্রী ইউনিয়নে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সাঙ্গু নদী। দুর্গম পাহাড়ি এই অঞ্চলে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের বসবাস। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিদ্যুতের অভাব তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বান্দরবানের দুর্গম অনেক এলাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ পৌঁছায়নি। কোথাও ছোট সৌর প্যানেল, কোথাও কুপি কিংবা মোমবাতিই রাতের একমাত্র আলো।
বান্দরবান বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ১,৫০০টি গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে। আরও প্রায় ৩০০ গ্রামে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ রয়েছে এবং প্রায় ৬০০ গ্রাম এখনো পুরোপুরি বিদ্যুৎবিহীন। বরাদ্দের অভাব ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ির বহু দুর্গম গ্রামে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও নৌকা, কোথাও দীর্ঘ পথ হেঁটে, আবার কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি সড়ক ব্যবহার করে যেতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংযোগ সম্প্রসারণও হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়াও এসব এলাকার মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ। অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরের বাজারে গিয়ে ফোন চার্জ দিতে হয়। এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়, কখনো কখনো শুধু একটি ফোন চার্জ করতেই দিনের বড় একটি অংশ চলে যায়।
স্বাস্থ্যসেবাতেও এর প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্গম এলাকার কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ ও টিকা সংরক্ষণসহ জরুরি সেবায় সমস্যা তৈরি হয়। রাতে রোগী এলে স্বাস্থ্যকর্মীদের টর্চ বা সৌরবাতির ওপর নির্ভর করতে হয়।
রেমাক্রীর বাসিন্দা হ্লাথোয়াই প্রু মারমা বলেন, “বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় অনেক কষ্ট হয়। তারা অনলাইন ও ডিজিটাল ক্লাসের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দ্রুত বিদ্যুৎ পৌঁছানো গেলে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আরও সহজ হবে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানও বাড়বে।”
গুংগুরু, বটতলী ও ব্রিকফিল্ড পাড়ার বাসিন্দা জনি ত্রিপুরা, অংশৈ ও লংরেং ম্রো বলেন, স্বাধীনতার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
তাঁরা বলেন, বিদ্যুতের অভাবে শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। দ্রুত দুর্গম গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
বান্দরবান বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন বলেন, জেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। দুর্গমতার কারণে অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে এসব এলাকাকে বিদ্যুতের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুত দুর্গম এলাকাগুলোতেও বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হবে।”
তবে দুর্গম পাহাড়ের বাসিন্দাদের কাছে বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়—শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা এসব মানুষের কাছে বিদ্যুতের সংযোগ এখনো উন্নত জীবনের একটি অপূর্ণ স্বপ্ন।
মন্তব্য করুন