
আসন্ন ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারছে না। শতভাগ পরীক্ষার্থী শূন্য থাকার এই নজিরবিহীন ঘটনায় বোর্ডের সামগ্রিক শিক্ষার মান, নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ ও নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
বোর্ড সূত্র জানায়, পরীক্ষার্থী শূন্য এই আটটি কলেজের মধ্যে চারটিতে এবার একজন শিক্ষার্থীও নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেনি। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৫ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থী থাকলেও, তারা কেউ চূড়ান্ত পরীক্ষার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
পরীক্ষার্থী শূন্য এই ৮টি কলেজের মধ্যে রয়েছে— ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কুমিল্লার তিতাস মডেল কলেজ, উলুকান্দি কলেজ, বেগম জহুরা মহিলা কলেজ, ষাইটশালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, সিসিএন মডেল কলেজ এবং ফেনী জেলার নোবেল কলেজ।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে শিক্ষা বোর্ডের কঠোর মূল্যায়ন নীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চ মাধ্যমিক) সালাহ্উদ্দিন জানান, এবার শিক্ষা বোর্ডের কঠোর নির্দেশনা ছিল যে সকল শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পরীক্ষায় দুই বিষয়ের অধিক ফেল করবে, তারা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। মূলত কলেজ অধ্যক্ষরা বোর্ডের এই নীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করে তালিকা পাঠানোয় অকৃতকার্য কোনো শিক্ষার্থী এবার অনৈতিকভাবে পরীক্ষার সুযোগ পায়নি।
এমন কঠোর নীতির প্রভাবেই দীর্ঘ ১২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় ধাক্কা খেয়েছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ষাইটশালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শিবু চন্দ্র সরকার বলেন, ২০১২ সাল থেকে আমাদের কলেজ শাখা চালু রয়েছে। এ বছর ১০ জন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও বোর্ডের কঠোর নিয়মের কারণে মূল্যায়ন পরীক্ষায় তারা কেউই চূড়ান্ত পরীক্ষার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। যার ফলে এবার আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না।
এদিকে তড়িঘড়ি করে কলেজ শাখার অনুমোদন দেওয়াকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জামাল নাসের বলেন, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে কলেজ শাখা চালু করা হলেও তা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এতে তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হয়, শিক্ষার মান কমে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। পরিকল্পিতভাবে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে আলাদা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
এই বড় বিপর্যয়ের পর নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ড প্রশাসন। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব কলেজ থেকে কোনো পরীক্ষার্থী অংশ নিতে পারেনি, তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করা হবে। কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন কিংবা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও স্বীকৃতি বাতিলের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, এ বছর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ৪৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৯৪ হাজার ৮০২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা ৫৭ হাজার ১৯৬ জন এবং ছাত্র সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬০৬ জন। এবার ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫ ৯০ জন বেশি।
মন্তব্য করুন