
তীব্র তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং, যার ফলে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো সাতক্ষীরা সদর উপজেলা। বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলার কোনো এলাকাতেই যেন স্বস্তি নেই। শহরের কাটিয়া, পলাশপোল, ইটাগাছা কিংবা সুলতানপুরের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের করুণ দশা দেখা দিয়েছে। তবে শহরের চেয়েও গ্রামীণ ফিডারগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয় আকার ধারণ করেছে।
সদরের ঝাউডাঙ্গা, বল্লী, ফিংড়ী, বাশদহা কিংবা কুশখালী ইউনিয়নে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে এই পরিস্থিতিকে সাধারণ বিভ্রাট বলতে নারাজ, তাদের মতে এটি এখন বিদ্যুতের এক ‘মহামারি’তে রূপ নিয়েছে।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের বিশাল ঘাটতি। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো মিলিয়ে পুরো জেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৯৫ মেগাওয়াট। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। এই সংকটের মাঝেও চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে গ্রামীণ অঞ্চলগুলো। পৌর এলাকায় তাও কিছুটা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও, সদরের গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুতের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জেলার সবকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে। সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরীর ৪২টি কারখানাসহ সদরের শত শত লেদ ও চালকলের উৎপাদন এখন পুরোপুরি লাটে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকেরা দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকছেন, অথচ কারখানা মালিকদের নিয়মিত বেতন ও পরিচালনা ব্যয় গুনতে হচ্ছে। কৃষি খাতেও নেমে এসেছে অন্ধকার। তীব্র দাবদাহের কারণে ফসলের মাঠ শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সংকটে সেচ পাম্পগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে আমন ও রবি শস্যের আবাদ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
একই সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাতের বেলা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ওদিকে প্রচণ্ড গরমে ডায়রিয়া, ভাইরাসজনিত জ্বর ও চর্মরোগের প্রকোপ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে প্রতিদিন অসুস্থ রোগীর ভিড় উপচে পড়ছে, যেখানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
বিদ্যুতের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক এলাকার ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তবে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় তাদের আসলে কিছুই করার নেই। এর ওপর তীব্র গরমের কারণে ফ্যানের পাশাপাশি এসির ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের ওপর বাড়তি লোড তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সীমিত সরবরাহ দিয়ে কোনোভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্রিড বিপর্যয় ও লোডশেডিংয়ের এই দ্বিমুখী সংকটে সাতক্ষীরা সদরের জনজীবন এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।
মন্তব্য করুন