
আজ ১৬ মার্চ, সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত। আজ দিবাগত রাত পবিত্র “লাইলাতুল কদর বা শবে কদর” হিসেবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটান। তবে ২০ রমজানের পর যেকোনো বিজোড় রাতেই পবিত্র শবে কদর হতে পারে।
আজ সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়েছে মহিমান্বিত এই রজনীর আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সারা দেশে এই পবিত্র রাতটি পালন করবেন।
কদর শব্দের গভীরে যে মহিমা:
কদর শব্দের অর্থ মর্যাদা, পরিমাপ, সিদ্ধান্ত, তাকদির অর্থাৎ এ রাত শুধু মর্যাদাপূর্ণ নয়; এটি নির্ধারণের রাতও। এ রাতে লিখিত হয় আগামী বছরের তাকদির, রিজিক, জীবন, মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ। এ রাতে সবকিছুর সিদ্ধান্ত আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাদের হাতে ন্যস্ত হয়। এই এক রাতেই জীবনের নতুন ভাগ্যলিপি রচিত হয়।
হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এ রাত:
পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস— একটি পূর্ণ মানবজীবনের সমান সময়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এই এক রাত ইবাদতে কাটালো, সে যেন একটি পূর্ণ জীবন ইবাদতে কাটানোর সওয়াব অর্জন করলো। এখানেই শবে কদরের অবাক বিস্ময়— আল্লাহ সময়কে সংকুচিত করে দিয়েছেন, যাতে অল্প সময়েই বান্দা অগণিত নেকি অর্জন করতে পারে।
পবিত্র কোরআনুল কারীমে শবে কদর বিষয়ে আল্লাহ বলেন, শপথ কিতাবের আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়। (সুরা দোখান, ২-৪)
হাদিসেও এই বরকতময় ভাগ্য রজনীর বহু ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। আনাস বিন মালেক রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, তোমাদের রোজার মাস দেওয়া হয়েছে। এই মাসে এমন এক সৌভাগ্যের রজনী রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি এই রাতেরে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, সে সব ধরনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। (ইবনে মাজাহ ১৬৪৪)
শবেকদরের রাত নির্ধারণে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। এ ছাড়া সাহাবি উবাই ইবনে কাব ও হজরত মুয়াবিয়া (রা.) সহ আরও অন্যান্য সাহাবা ২৭ রোজার রজনীকে শবেকদর বলে মত দিয়েছেন।
শায়খুল হাদিস যাকারিয়া রহ. বলেন, এই রাতে পৃথিবীর সব বস্তু প্রভুর কুদরতি পায়ে সিজদাহ করে, বৃক্ষরাজি ও প্রাণিকুল আল্লাহর তাসবিহ পড়ে। ভাগ্য রজনীর আংশিক নয় পুরো বরকত যেন আল্লাহ আমাদের দান করেন।
শবে কদরে আমাদের করণীয়:
ক. কদরের ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নফল ইবাদত করা, নফল নামাজ আদায় করা। কোরআন তিলাওয়াত করা, তাসবিহ তাহলিল পাঠ করা ইত্যাদি।
খ. লাইলাতুল কদর হলো বছরের শ্রেষ্ঠ রাত। এ রাতের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো ক্ষমা চাওয়ার দোয়া। এ রাতে মহানবী (সা.) ক্ষমা চাওয়ার দোয়া শিক্ষা দিলেন যে, তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও, ক্ষমা পাওয়ার জন্য দোয়া করো। হাদিস শরিফে আছে, হযরত আয়েশা (রা.) মহানবীকে (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসূল আল্লাহ! যদি আমি বুঝতে পারি শবেকদর কোনো রাত, তাহলে ওই রাতে আমি কী বলব? আল্লাহর কাছে কী চাইব? প্রিয় নবী (সা.) বললেন তুমি বলবে, হে আল্লাহ আপনি বড়ই ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতে আপনি ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। আরবি দোয়া হলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা, আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া, ফাওফু আন্নি (ইবনে মাজাহ)।
গ. এ রাতের আরেকটি আমলে ফুকাহায়ে কেরামগণ বলেছেন, এ রাতে ইবাদাতের পূর্বে যদি কেউ গোসল করে নিতে পারে তার সেটাই উত্তম। উক্ত আমলগুলো শুধু ২৭ রমজান নয় বরং রমজানের শেষ দশকের প্রত্যেক বিজোড় রাতে শবেকদর তালাশ করা যেতে পারে। এ জন্য মহানবী সা. রমজানের শেষ দশ দিনে ইতেকাফ করতেন। আল্লাহ তায়ালা রমজানের সকল কল্যাণ আমাদের দান করুন, আমিন।
মন্তব্য করুন