
বগুড়ার ধুনটে আবাসিক ছাত্রদের যৌন নিপীড়ন ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে ধুনট দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং উপজেলা মডেল মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল বাসেতকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। বুধবার (১৪ মে) বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে লিখিতভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা আব্দুল বাসেত দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্রদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ, যৌন নিপীড়ন ও মানসিক নির্যাতন করে আসছিলেন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। অবশেষে নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থী সোমবার (১২ মে) ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে প্রতিকার দাবি করে। এরপর ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। ইউএনও আরিফ উল্লাহ নিজামী ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। বুধবার তদন্ত কমিটির সামনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ঘটনার বিস্তারিত জবানবন্দি দেয়। এ সময় মাদ্রাসার মুহতামিমসহ অন্যান্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত শিক্ষক নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী ও একাধিক শিক্ষক জানান, মঙ্গলবার রাত থেকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়। এমনকি প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কিছু শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা এবং পুলিশি ভয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার মাদ্রাসার প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় মাদ্রাসার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দ্রুত সুষ্ঠু বিচার চাই।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং তাদের মাদ্রাসায় ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। পরে ধুনট কওমি ওলামা পরিষদের সেক্রেটারি মাসুদুর রহমান সুমন শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করলে কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে। মাদ্রাসার মুহতামিম শফিকুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এবং শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষক মাওলানা আব্দুল বাসেতকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
মাদ্রাসার আরেক সিনিয়র শিক্ষক ও ধুনট কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা আরিফুল্লাহ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শিক্ষকদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষককে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য করুন