
বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় মানচিত্রে পটুয়াখালীর পায়রা ও কুয়াকাটা এখন কেবল পর্যটন বা বন্দরের নাম নয়, বরং আগামীর ‘সুনীল অর্থনীতির’ (Blue Economy) প্রবেশদ্বার। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ও মহাপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন, তা উপকূলীয় লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের প্রতিফলন।
২০৪৬ সালের ভিশন বাস্তবায়নে এই অঞ্চলকে ‘অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড’ হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে সন্দেহ নেই। তবে এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের সুফল গরে তুলতে হলে শুধু ঘোষণা নয়, প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার ও পরিবেশগত সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। ২০১২ এবং ২০১৬ সালে পৃথক দুটি উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে তা নথিপত্রেই আটকা পড়ে ছিল। পূর্বের সেই স্থবিরতা কাটিয়ে বর্তমান মহাপরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ১ লক্ষ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রসীমাকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ, খনিজ উত্তোলন এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা।
বর্তমানে কুয়াকাটার উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে বিচ্ছিন্নভাবে। পর্যটন এলাকা হলেও এখানে পরিকল্পিত নগরায়ণের বালাই নেই। একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র ‘কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (KDA) না থাকায় সমন্বিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার চরম অবনতি এবং সরকারি জমি দখলের মহোৎসব চলছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আদলে একটি শক্তিশালী সংস্থা থাকলে নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার (STP) স্থাপন এবং পরিবেশ রক্ষা—সবই একক নিয়ন্ত্রণে আসা সম্ভব হতো। এটি না হওয়া পর্যন্ত কুয়াকাটার উন্নয়ন হবে অপরিকল্পিত ও ক্ষণস্থায়ী।
পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটার বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলানো কলাপাড়া উপজেলার একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক কাজের জন্য স্থানীয়দের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়, যা সময় ও অর্থের অপচয়। কুয়াকাটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পর্যটন উপজেলা’ অথবা একটি পৃথক ‘পর্যটন জেলা’ হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। এতে করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিশ্ছিদ্র পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। সরাসরি কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়া সহজ হবে। এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক সেবা এক জায়গায় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সরকারের এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে কারিগরি প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের দাবি অনুযায়ী, এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানীয় যুবকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যদি স্থানীয় জনবলকে দক্ষ করা না যায়, তবে এই মেগা প্রকল্পের সুফল ভোগ করবে বহিরাগতরা, যা উপকূলীয় অর্থনীতিতে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
উন্নয়ন অবশ্যই কাম্য, তবে তা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে কুয়াকাটা উপকূলে ডলফিনের মৃত্যু এবং সমুদ্রের ক্রমাগত ভাঙন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃতি হুমকির মুখে। ৭’শ কোটি টাকার সৈকত রক্ষা প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। শিল্পায়নের ফলে যেন সৈকতের ভূ-প্রকৃতি বদলে না যায় এবং বর্জ্য যেন সরাসরি সমুদ্রে না মেশে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, পায়রা ও কুয়াকাটা ঘিরে সরকারের এই মহাপরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ‘কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন এবং একে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারের এই মহাপরিকল্পনা দেশের দক্ষিণ জনপদের ভাগ্য বদলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
পরিবেশ ও উন্নয়ন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ পর্যটন গন্তব্য।
২০৪৬ সালের ভিশন বাস্তবায়নে কুয়াকাটা হোক একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব মডেল নগরী।
মন্তব্য করুন