
জাতিগত নিধন ও সহিংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংকটের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই সময়ে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি এলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সহিংসতার পর কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে গড়ে ওঠে বিশাল শরণার্থীশিবির। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর বড় একটি অংশ শিশু, যাদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে এবং মিয়ানমারের নিজস্ব ভূমি সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।
নতুন করে অনুপ্রবেশ
রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের শরণার্থী সংকটের সঙ্গে নতুন অনুপ্রবেশ যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের ওপর মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ আরও বাড়িয়েছে।
প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৭ সালের পর পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা এবং একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের অনাস্থা ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তা কার্যকর হয়নি।
এরপর মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন এবং রাখাইনে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও পিছিয়ে দেয়। বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও যুদ্ধাবস্থার কারণে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
এদিকে মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। সম্প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের কথা জানানো হলেও তাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, জাতিসংঘের নিবন্ধনেই রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সংকুচিত হচ্ছে সহায়তা
শরণার্থীশিবিরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায়ও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা সংকুচিত হয়েছে। সীমিত আয়-রোজগার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা, মাদক চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো সমস্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেকে দালালের মাধ্যমে সাগরপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাও ঘটছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শিশুদের ভবিষ্যৎ
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শিশু। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের অনেকেরই মিয়ানমারের নিজস্ব সংস্কৃতি, পরিবেশ ও বসতভিটা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেই। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বেড়ে ওঠার কারণে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশুই নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে না। ফলে প্রত্যাবাসন আরও দীর্ঘায়িত হলে একটি প্রজন্ম শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়িত্ব শুধু শরণার্থীদের নয়, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস, সীমিত সম্পদ, কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন সমস্যা স্থানীয়দের মধ্যেও চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। সরকারের অবস্থান, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
আশার জায়গা কি আছে?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার মধ্যেও কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন কিছু সম্ভাবনার কথা সামনে আসছে। চীনসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কূটনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; রাখাইনে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন শুরুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নয় বছর পেরিয়েও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংকট আর কত দীর্ঘ হবে এবং কবে নাগাদ বাস্তব অর্থে নিজভূমিতে ফেরার সুযোগ পাবেন রোহিঙ্গারা।
মন্তব্য করুন