
উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শহরাবাড়ী এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ ভাঙনে একের পর এক ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। নদীপাড়ের মানুষের মনে এখন একটাই শঙ্কা—যমুনার ভাঙন অব্যাহত থাকলে শহরাবাড়ীর অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকুও কি টিকবে?
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরাবাড়ী স্পার থেকে বানিয়াজান স্পার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যমুনার তীব্র ভাঙন চলছে। নদীর তীরবর্তী শহরাবাড়ী ও শিমুলবাড়ী গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন ধীরে ধীরে জনবসতির দিকে এগিয়ে আসায় শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ও বসতভিটা এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মাসের শুরু থেকে উজানের ঢলে যমুনার পানি বাড়তে থাকে। নদীতে তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হওয়ার পর গত ১৯ জুন থেকে শহরাবাড়ী এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতিদিনই নদীতীরের কোনো না কোনো অংশ ধসে পড়ছে। একসময়ের সবুজ ফসলের মাঠ, পাটখেত ও মানুষের স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি মুহূর্তেই তলিয়ে যাচ্ছে নদীর পানিতে।
ভাঙন রোধে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলছে। তবে যমুনার প্রবল স্রোতের কারণে কয়েকটি স্থানে সেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে পাটসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন। অনেকেই নিজের চোখের সামনে ফসলের জমি ও জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
শহরাবাড়ী গ্রামের কৃষক শামছুল হক বলেন, “নদী আগে অনেক দূরে ছিল। ঋণ করে পাট চাষ করেছিলাম। কয়েক দিনের ভাঙনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন ভিটেমাটিও হারানোর ভয়ে আছি।”
ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, “ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে ভাঙন বেড়ে এখন জনবসতির দিকে চলে এসেছে। সাময়িকভাবে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে শহরাবাড়ী ও শিমুলবাড়ী গ্রামের বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ার পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এ বিষয়ে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, “শহরাবাড়ী এলাকায় ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।”
তবে নদীপাড়ের মানুষের চোখে এখনো আতঙ্কের ছায়া। নদীতীরের মাটি ধসে পড়ার প্রতিটি শব্দে কেঁপে ওঠে তাদের বুক। ফসলি জমি ও বসতভিটা রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যমুনার করাল গ্রাসে শহরাবাড়ীর বড় একটি অংশ হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
মন্তব্য করুন