আশেকে এলাহী শিবলী, ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি
২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮:৪১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ধুনটে ২০২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০৩টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক, ভারপ্রাপ্তের চাপে বিপর্যস্ত পাঠদান

Share this news with

বগুড়ার ধুনটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। উপজেলার ২০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৩টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক, অর্থাৎ প্রায় ৫১ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের সংকটও—উপজেলায় ১১৪টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে প্রশাসনিক চাপ, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদানও, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর।

ধুনট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১টি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন মিলিয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা—মথুরাপুরে ১৬টি, গোপালনগরে ১৪টি, নিমগাছিতে ১৪টি, ভান্ডারবাড়িতে ১৩টি, কালেরপাড়ায় ১০টি, চৌকিবাড়ী, গোসাইবাড়ী, চিকাশী ও এলাঙ্গীতে ৮টি করে, সদর ইউনিয়নে ২টি এবং পৌরসভায় ১টি।

এই সংকটের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিন পরিদর্শনে। গোপালনগর ইউনিয়নের রান্ডিলা আতাউল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ১০২ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে ৭ শিক্ষকের পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৪ জন। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে দূর থেকে কেউ এসে শিক্ষকতা করতে চান না বলেও জানান তিনি।

১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৭৪ সালে জাতীয়করণ হওয়া পৌরসভার ভরণশাহী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রায় দুই বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ৬২৬ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে ১৮ শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ জন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ২০২৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় অন্য শিক্ষকদের পাঠদানে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছি, একজন প্রধান শিক্ষক এলে প্রতিষ্ঠানের গতি আরও বাড়বে।

২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া উলুরচাপড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদটি এখনো পূরণ হয়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফেরদৌস মাহমুদ বলেন, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকায় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়। দীর্ঘ দশ বছর প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শাম্মী সুলতানা বলেন, সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় দাপ্তরিক কাজে প্রায়ই বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। শিক্ষক সংখ্যাও কম হওয়ায় প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান দুটোই সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের শ্যামবাড়ি বালিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ঝুমা, আরাফাতসহ কয়েকজন জানায়, নিয়মিত ক্লাস হলেও প্রধান শিক্ষক না থাকায় ক্লাসের বাইরের বিভিন্ন কার্যক্রম ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে।

অভিভাবকরাও এই সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেন না, বরং একাডেমিক কার্যক্রম তদারকি, নথিপত্র সংরক্ষণ ও অভিভাবক-শিক্ষা বিভাগের মধ্যে যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অভিভাবক রাফিউল ইসলাম বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তার সন্তান প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাচ্ছে না বলে তাকে আলাদাভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে, এমনকি অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তির কথাও ভাবছেন তিনি।

কেন এই পদগুলো এত বছর ধরে শূন্য থেকে যাচ্ছে—এই প্রশ্নের জবাবে ধুনট উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সবুর বলেন, নিয়োগ, পদোন্নতি, মামলা ও প্রশাসনিক নানা জটিলতাই মূলত এর পেছনে দায়ী। তার আশঙ্কা, প্রাথমিক পর্যায়ে এমনিতেই যে শিখন-ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আছে, শিক্ষক সংকট তার সঙ্গে যুক্ত হলে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সময় শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা আরও বাড়তে পারে।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন ধুনট উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাইয়্যেদা জাহান বানু। তিনি বলেন, শূন্য পদের বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যে উপজেলার ৬১টি বিদ্যালয়ে নতুন প্রধান শিক্ষক যোগদান করবেন। তার ভাষায়, নিয়োগ সম্পন্ন হলে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রমে যেমন গতি ফিরবে, তেমনি এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে শিক্ষার মানেও।

তবে ৬১টি পদ পূরণ হলেও বাকি থেকে যাচ্ছে আরও ৪২টি বিদ্যালয়, যেখানে কবে নাগাদ স্থায়ী প্রধান শিক্ষক যোগ দেবেন তা এখনো অনিশ্চিত। ততদিন শিক্ষক ও অভিভাবকদের একটাই দাবি।শ্রেণিকক্ষ আর দাপ্তরিক চেয়ারের মাঝে ভাগ হয়ে থাকা শিক্ষকদের এই বাড়তি বোঝা লাঘব করে দ্রুত সব শূন্য পদ পূরণ করা হোক, যাতে ধুনটের শিশুরা তাদের প্রাপ্য শিক্ষাটুকু ঠিকভাবে পায়।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ট্রাইব্যুনাল-১ এ জিয়াউল আহসানের গাড়িবহর প্রবেশ

১

শহরের সুবিধার অর্থনীতি আসলে কার কাঁধে দাঁড়িয়ে?

২

গোবিপ্রবিতে মধ্যরাতে দুর্বৃত্তদের ককটেল নিক্ষেপ

৩

ধুনটে নিখোঁজ বড় ভাইকে খুঁজে পেতে থানায় ছোট ভাইয়ের অভিযোগ

৪

আদমদীঘিতে দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা চাইল পূজা উদযাপন ফ্রন্ট

৫

বগুড়ায় সচেতনতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক: জাল টাকা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি ঠেকাবে ‘বাংলা কিউআর’

৬

মায়ের অপেক্ষায় তিন বছরের শিশু, সাবিহাকে বাঁচাতে প্রয়োজন ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা

৭

পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়ন ও সম্প্রীতি রক্ষায় একসঙ্গে কাজের প্রত্যয় তিন জেলা পরিষদ

৮

নন্দীগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড প্রতিহত করবে যুবদল, বিক্ষোভ সমাবেশ

৯

ধুনটে বিধবা নারী ধর্ষণের অভিযোগ

১০

ধুনট উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ

১১

‎শেরপুরে পূজা উদযাপন পরিষদের দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা

১২

ঠাকুরগাঁওয়ে ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির কমিটি বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি

১৩

স্বপ্নের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র দেখতে চাই: আবরার ফাহাদের ৭ম শাহাদাতবার্ষিকীতে বিচার দ্রুত কার্যকরের দাবি

১৪

গোবিপ্রবিতে আন্তঃবিভাগ ভলিবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ

১৫

নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসকূপের সন্ধান, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৭০ লাখ ঘনফুট

১৬

গোপালগঞ্জে এসএসসি জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা, প্রধান অতিথি গোবিপ্রবি উপাচার্য

১৭

জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত ৫ শিক্ষার্থীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন গোবিপ্রবি উপাচার্য

১৮

সান্তাহারে পুকুরে যাতায়াতের পথে কাঁটাতারের বেড়া, মিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ

১৯

ঠাকুরগাঁওয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১২৭ মন্দির কমিটির সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক সভা

২০