
মামলা, গ্রেপ্তার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা কোনোটিই থামাতে পারছে না বগুড়ার ধুনটে মাদকের বিস্তার। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকাজুড়ে প্রায় ১৮০টি পয়েন্টে ইয়াবা, হেরোইন, ট্যাপেন্টাডল, আইস, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান ও মামলা সত্ত্বেও মাদক কারবারিদের তৎপরতা কমেনি। বরং যমুনা নদী ও চরাঞ্চলকে ব্যবহার করে ধুনট এখন উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলার মাদক পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি সীমান্ত হয়ে হেরোইন, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজা এবং টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান ধুনটে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা এসব চালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি। পরে যমুনার শহরাবাড়ী ঘাটসহ বিভিন্ন নৌপথে এসব মাদক জামালপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
একইভাবে জামালপুর ও কাজিপুরের চরাঞ্চল থেকেও নৌপথে গাঁজার চালান ধুনটে আসে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যবহার করে ইয়াবার চালান পরিবহনের ঘটনাও ঘটছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে। মথুরাপুর ও পাঁচথুপী এলাকার একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, মাদকের টাকা জোগাড় করতে সন্তানদের কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এমনকি দুই পরিবারের অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন।
মথুরাপুরের হিজুলী গ্রামের প্রটেকশন ফর লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, মাদকের প্রভাব থেকে তার নিজের পরিবারও নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার সদস্য মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, শুধু মথুরাপুর ইউনিয়নেই মাদক বেচাকেনার সঙ্গে দেড় হাজারের বেশি মানুষ জড়িত। তবে এই সংখ্যা সরকারি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মথুরাপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসানুল করিম পুটু ও গোপালনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জানান, মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে তরুণদের একটি অংশ বিপথে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও প্রত্যাশিত প্রতিকার মিলছে না বলে তাদের অভিযোগ।
মাদক কারবারে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মথুরাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। মাদকে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের ধুনট উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ও এলাঙ্গী ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক উজ্জ্বল মিয়াকে দলীয়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ২৮ জুন ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলামের ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলার সব ইউনিয়ন যুবদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে জাহিদুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়া তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেছেন। উজ্জ্বল মিয়ার ভাষ্য, ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে মাদক মামলার আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেল্লাল হোসেন, আলী আকবর, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাসেল, রাসেলা, রফিকুল, সেতু, দুলাল, আমিনুল, রূপালী, রফিক, বাদশা মিয়া, সেলিম ও উজ্জ্বল মিয়াসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বক্তব্য সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হলো।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব বা আশ্রয়ের কারণে অনেক সময় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। তবে ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলম বলেন, মাদকের বিষয়ে দলের কোনো ছাড় নেই। দলের কেউ জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ২৮ জনকে জেল-জরিমানা এবং পুলিশের অভিযানে ৬১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৫৪৪ পিস ইয়াবা, ৩১৭ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৮ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজা ও ১২ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩২টি মামলা হয়েছে।
তবে অভিযান ও মামলা সত্ত্বেও মাদক কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকট এবং বিস্তৃত চরাঞ্চলের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশি অভিযানের খবর পেয়ে কারবারিরা পালিয়ে যায় এবং সাক্ষীর অভাবে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-সহ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও মাঠপর্যায়ে মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ কাটছে না। তাদের প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও যদি একই এলাকায় বারবার নতুন কারবারি সক্রিয় হয়, তাহলে শুধু খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার নয়, মাদকের মূল উৎস, সরবরাহকারী ও নেপথ্যের অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা কতটা সম্ভব হচ্ছে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন