
বগুড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনমনে। একই সময়ে শতাধিক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে ও জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত দুই মাসে ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার আয়াত নামে সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে ২২ মে আবদুর রহমান নামে পাঁচ মাস বয়সী শিশু এবং ২০ মে আদদান নামে ছয় মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়।
বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে ১০ জন এবং ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালে দুজন করে ভর্তি হয়েছে।
একই সময়ে ১৯ জন শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শজিমেক হাসপাতাল থেকে ১৫ জন, ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দুজন করে ছাড়পত্র পেয়েছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৫ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে শজিমেক হাসপাতালে ৪৮ জন, মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নয় জন এবং টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালে আট জন চিকিৎসাধীন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২৯ মার্চ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৮৮ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। সন্দেহভাজন ৫২৩ জনের মধ্যে ৪৩৩ জনের রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ১৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ধুনটে তিন জন, সদর উপজেলায় তিন জন, শেরপুরে একজন, গাবতলীতে দুজন, শাজাহানপুরে তিন জন, কাহালুতে একজন, সোনাতলায় একজন, শিবগঞ্জে একজন এবং বগুড়া পৌরসভায় তিন জন রয়েছে।
এদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন আট শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শেরপুরে একজন, গাবতলীতে দুজন, শাজাহানপুরে একজন, শিবগঞ্জে একজন, ধুনটে একজন এবং সদরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ল্যাব পরীক্ষায় শেরপুরের এক শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। বগুড়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্যান্য জেলার আরও নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, হামের সরাসরি সংক্রমণের চেয়ে পরবর্তী জটিলতাই শিশুদের জন্য বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। মৃত শিশুদের অধিকাংশই নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) জনিত জটিলতায় আক্রান্ত ছিল। তালিকাভুক্ত শিশুদের মধ্যে শেরপুরের আট মাস বয়সী শিশু রাশমিকার ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়া যায়। অন্যদের ক্ষেত্রে তীব্র উপসর্গের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে রাখা হয়েছিল।
সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম বলেন, “গত দুই মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নয় জন বগুড়ার এবং বাকি নয় জন অন্য জেলার বাসিন্দা।”
তিনি আরও জানান, ২৯ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বগুড়া শহরের দুটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালসহ উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৫৮৮ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। তবে জেলায় হামের সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় এখনো বগুড়াকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং উপসর্গ বাড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন