
জন্ম নিলে মৃত্যু অবধারিত—এই চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়েই জীবনের শেষ যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছেন বান্দরবানের টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ৩১০ নম্বর টংকাবতী মৌজার হেডম্যান পূর্ণচন্দ্র ম্রো (৭৮)। সাড়ে চার বছর আগেই তিনি নিজের জন্য কদম গাছের কাঠ দিয়ে একটি কফিন তৈরি করে বাড়িতে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
সম্প্রতি টংকাবতী ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যত্নসহকারে তৈরি করা সেই কফিনটি ঘরের একপাশে রাখা রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
পূর্ণচন্দ্র ম্রো ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে তার বাবা রেংথম ম্রো’র মৃত্যুর পর তিনি ৩১০ নম্বর টংকাবতী মৌজার হেডম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর প্রায় চার দশক ধরে মৌজাবাসীর সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আর কতদিন? জীবনে যা পাওয়ার ছিল সবই পেয়েছি। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী কর্মফলে বিশ্বাস করি। মানুষ ভালো কাজ করলে ভালো ফল, আর মন্দ কাজ করলে মন্দ ফল ভোগ করতেই হবে। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তাই নিজের ইচ্ছায় সাড়ে চার বছর আগে কদম গাছের কাঠ দিয়ে নিজের কফিন তৈরি করে রেখেছি।’
তিনি জানান, তাদের তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ছোট বোন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। জীবনে আর কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা নেই বলেও জানান তিনি।
পূর্ণচন্দ্র ম্রোর মেজো ছেলে মেনপুং ম্রো বলেন, ‘বাবা সাড়ে চার বছর আগে থেকেই মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নিজের ইচ্ছায় কদম গাছের কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করেছেন। আমরা বাধা দিইনি। কারণ এতে তিনি কষ্ট পেতেন।’
টংকাবতী ইউনিয়নের পূর্ণবাসন চাকমাপাড়ার কার্বারি (গ্রাম প্রধান) আনন্দ মোহন চাকমা বলেন, পূর্ণচন্দ্র ম্রো একজন অত্যন্ত সৎ, নীতিবান ও পরোপকারী মানুষ। দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে মৌজা হেডম্যান হিসেবেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং বিচার-সালিশে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত-অপরিচিত বিবেচনা না করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। তিনি পূর্ণচন্দ্র ম্রোর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাংয়াং ম্রো প্রদীপ বলেন, ‘আমার বাবার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। তিনি বাস্তববাদী মানুষ। তার কাছ থেকেই জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা নিজের ইচ্ছায় কদম গাছের কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করে রেখেছেন। বাড়িতে কফিনটি দেখলে কখনো হাসি পায়, আবার ভাবতেও হয়—মানুষটি জীবনের শেষ যাত্রার জন্য কতটা মানসিকভাবে প্রস্তুত। আমরা সবাই তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
মন্তব্য করুন