
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়ার লতিফপুর কলোনীর ঐতিহ্যবাহী প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন নেই। দেড়যুগ ধরে উন্নয়ন বঞ্চনায় মুখ থুবড়ে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। পাঠদানের জন্য বর্তমানে টিনশেড ঘরই যেন একমাত্র ভরসা। নানা প্রতিবন্ধকতায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ জন। এরমধ্যেই স্কুলের জায়গা বেদখল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত একতলা ভবন ভেঙে ফেলার পর স্কুলের ৩৬ শতক জায়গার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৯ শতকই বেদখল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবৈধ দখল ও অবকাঠামোগত সংকটে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। স্কুলের জায়গা অবৈধ দখলের অভিযোগ ওঠায় নড়েচড়ে বসেছে বগুড়ার শিক্ষা প্রশাসন।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ একযুগ উন্নয়ন বঞ্চনার মুখে থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। ভবন না থাকায় টিনের ঘরে পাঠদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। স্কুলের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের সামগ্রী রেখেছে প্রভাবশালীরা। প্রতিষ্ঠানের একাংশ জায়গা যেন পাথর, ইট, বালু ও রডের ভাসমান দোকান। নির্মাণ সামগ্রীর কারণে দুর্ঘটনার শঙ্কায় সন্তানকে স্কুলে পাঠাতেও অভিভাবকের অনীহা। অবৈধ দখল, ভবন না থাকাসহ মাঠ ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে বলে জানিয়েছেন খোদ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, শহরের লতিফপুর কলোনী এলাকায় ১৯৭৩ সালে প্রীতি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে স্কুলটি জাতীয়করণ করেন। লতিফপুর মৌজার ৩৬ শতক জমি পরিত্যক্ত সম্পত্তি বিদ্যালয় বরাবর বরাদ্দ দেয় জেলা প্রশাসন। ২০১৩ সালে ঝুকিপূর্ণ একতলা ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কতিপয় দাপুটেরা নিলামের নামে পুরাতন ভবন কিনে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র জানায়, লতিফপুর মৌজার এমআরআর ৪০, ৪১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর দাগের শূন্য দশমিক ৩৬ একর পরিত্যক্ত সম্পত্তি প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অনূকূলে ২০১১ সালের আগে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই জায়গা সংক্রান্তে ২০২১ সালেও জেলা পরিত্যক্ত বাড়িঘর পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন ভবন না হওয়ায় স্কুলের নামে বরাদ্দকৃত জায়গা দখলে নিয়েছেন সাবেক মহিলা কাউন্সিলরসহ কয়েকজন প্রভাবশালী। স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল শিক্ষা প্রকৌশল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও বাস্তবায়ন হয়নি। গণপূর্ত বিভাগের জমি হওয়ার কারণে পিছিয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। একটি টিনের ঘর তুলে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৬ শতক জায়গার ১৯ শতক বেদখল হওয়ার পর বর্তমানে টিকে আছে ১৭ শতক। চিত্র ধারণ ও সংবাদের তথ্য সংগ্রহরত সাংবাদিককে দেখে নেওয়া হবে বলে শাসানো হয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরানোর দাবি করেছেন লতিফপুর কলোনী মহল্লার বাসিন্দারা।
ব্যবসায়ী এস এম ফারুক বলেন, আমি নিজেও এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। আগে গর্ব করতাম, এখন গর্ব করার মতো কিছুই নেই। আমাদের সন্তান স্কুলে যায়। স্কুলের জায়গায় নির্মাণ সামগ্রী রাখায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আছে। এজন্য বাচ্চারা স্কুলে যেতে চায় না। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ইসমত আরা ও সহকারী শিক্ষিকা লতিফা রহমান জানান, একসময় স্কুলে পরিপূর্ণ শিক্ষার্থী ছিল। ভবন না থাকায় টিনের ঘর তুলে সাময়িক কার্যক্রম চলছে। অবৈধ দখল, নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখাসহ মাঠ ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। বর্তমানে ৭২ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানে ৬ জন শিক্ষকের স্থলে ৫ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন।
এদিকে, অবৈধ দখল বিষয়ে কয়েকজন প্রভাবশালীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। দৈনিক আমার দেশ স্টাফ রিপোর্টার সবুর শাহ্ লোটাস বলেন, স্কুলের জায়গা দখল চিত্র ধারণ, তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদের জেরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সাবেক মহিলা কাউন্সিলর মোবাইলে কল করে আমাকে শাসিয়েছে। সচিত্র প্রতিবেদন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে যাওয়ায় হুমকি দিচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে থানায় জিডি করেছি।
এ প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রেজোয়ান হোসেন বলেন, জায়গা দখল ও নির্মাণ সামগ্রী রাখার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি। অবৈধ দখলদারদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে স্কুলের জায়গা থেকে নির্মাণ সামগ্রী অপসারণ করা না হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করছেন।
মন্তব্য করুন