
ইসরায়েলের ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সর্বাধিক আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরও এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। ফলে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দেশের জন্যও এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গণনা অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে পেয়েছে ২৭টি আসন। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগের সংসদে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের আসন ছিল ৬৮টি, যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে। অর্থাৎ, সংসদে উল্লেখযোগ্য সমর্থন হারিয়েছে তাঁর জোট। তবে এই ফলাফলকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করাই প্রধান শর্ত। ফলে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি বিরোধীরা বিকল্প সরকার গঠন করবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
গাজা যুদ্ধ ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা তাঁর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ায়।
তবে নির্বাচনের ফলাফল একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলের ফিলিস্তিননীতি কতটা পরিবর্তিত হবে? নির্বাচনের ফলাফল থেকে এর কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থানেও নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন সরকার গঠিত হলেও গাজা, পশ্চিম তীর কিংবা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাৎক্ষণিক ও মৌলিক পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আরব দলগুলোর আসন বৃদ্ধি, সরকার গঠনে নতুন হিসাব
এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসন বৃদ্ধি ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি এবং রা’আম পেয়েছে ৮টি আসন। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের এই বৃদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ।
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের ৪৮টি আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যোগ করলে মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭টি। সংখ্যার হিসাবে এটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে বেশি। তবে এই সমীকরণকে নিশ্চিত সরকার গঠনের জোট হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক জোট গঠনে অনিচ্ছুক। ফলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর ভূমিকা রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান
ইসরায়েলের নির্বাচনের তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিনের এবং সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আবারও এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ সদস্যপদ এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ ছাড়া ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ইরিন জুবাইদা খান গাজায় আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
এসব অবস্থান বিবেচনায় ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফিলিস্তিন প্রশ্নে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ অঞ্চলে সংঘাত ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। ফলে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও ইসরায়েলের নির্বাচন সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে না, তবে এর পরবর্তী আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নতুন সমীকরণে শান্তির সম্ভাবনা কতটুকু?
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ইসরায়েলি নির্বাচনকে কেবল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারাবেন কি না, সেটি আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। তবে তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গাজার পুনর্গঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো আঞ্চলিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অর্থনীতি, কূটনীতি ও মানবিক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
মন্তব্য করুন