এলিন মাহবুব, কলামিস্ট
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নারীরা কথা বলবেন, কিন্তু নিরাপদ থাকবেন তো?

Share this news with

একজন নারী যখন নিজের মত প্রকাশ করেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন কিংবা সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন অনেক সময় তাঁর বক্তব্যের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, চেহারা ও চরিত্র। যুক্তির জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে অপমান, হুমকি ও চরিত্রহননের শিকার হতে হয়। যেন জনপরিসরে কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে একজন নারীকে প্রতিনিয়ত অপমান সহ্য করার প্রস্তুতি রাখতে হবে। প্রশ্ন হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মূল্য কি নারীদের জন্য এতটাই বেশি?

জনপরিসর বলতে শুধু রাজনীতির মঞ্চ নয়; সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আদালত, কর্মক্ষেত্র ও নাগরিক আন্দোলনও এর অংশ। এসব জায়গায় নারীরা নিজেদের মতামত তুলে ধরলে অনেক সময় তাঁদের বক্তব্যের বিষয়বস্তুকে ছাপিয়ে যায় নারী পরিচয়। পুরুষের ক্ষেত্রে যে সমালোচনা রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে বিবেচিত হয়, নারীর ক্ষেত্রে তা কখনো যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন গালাগাল কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়।

এই নিপীড়নের প্রভাব শুধু আক্রান্ত নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অন্য নারীদের জন্যও এটি নীরব থাকার বার্তা তৈরি করে। কোনো নারী সাংবাদিক ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে অনলাইনে হুমকির শিকার হতে পারেন। নারী অধিকারকর্মী বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতে পারে। আবার নারী রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্তের সমালোচনার জবাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে আনা হতে পারে। এসব আক্রমণের উদ্দেশ্য অনেক সময় যুক্তির মাধ্যমে কাউকে পরাজিত করা নয়, বরং ভয় দেখিয়ে তাঁকে জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়ালেও একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি, যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য এবং বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে অনেক নারী প্রকাশ্যে মতামত দেওয়া কমিয়ে দেন কিংবা পেশাগত পরিচয় ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য হন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন নারী নন, বরং সমাজের বহুমাত্রিক মতপ্রকাশের পরিবেশও।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সব সমালোচনাই নিপীড়ন নয়। জনজীবনে সক্রিয় ব্যক্তিদের বক্তব্যের যৌক্তিক সমালোচনা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমালোচনা যখন লিঙ্গবিদ্বেষ, যৌন হুমকি, ব্যক্তিগত অপমান কিংবা সহিংসতার ভয় দেখানোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তা আর সুস্থ মতবিনিময়ের পর্যায়ে থাকে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই স্বাধীনতা প্রয়োগের নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল যৌন নিপীড়নের অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্তের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের অপব্যবহার রোধ, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখাও জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকে হয়রানিমূলক বিষয়বস্তু মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গণমাধ্যমকেও নারীদের বক্তব্যের পরিবর্তে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নারীদের নীরবতাকে সম্মান, শালীনতা কিংবা নিরাপত্তার একমাত্র উপায় হিসেবে উপস্থাপনের সামাজিক প্রবণতা বদলাতে হবে। একজন নারীকে নিরাপদ রাখতে তাঁর কণ্ঠস্বর সীমিত করা কোনো সমাধান নয়; বরং তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত নিপীড়ন বন্ধ করাই প্রকৃত সমাধান।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কে কথা বলবেন, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও অধিকার দিয়ে। নারীদের মতপ্রকাশের মূল্য যদি হয় অপমান, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা, তবে সেই সমাজের স্বাধীনতা এখনো অসম্পূর্ণ।

কথা বলার জন্য নারীদের সাহসী হতে হয়—এটি বাস্তবতা হতে পারে। কিন্তু কথা বলার কারণে তাঁদের নিপীড়ন সহ্য করতে হবে, এটিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। নারীর কণ্ঠস্বরকে শুধু সহ্য করা নয়, বরং সমান নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রকৃত পরীক্ষা।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সান্তাহারে কলেজ ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির হুমকি- ইউএনও ও থানায় অভিযোগ

১

এসএসসিতে ফেল করলেই বছরজুড়ে অপেক্ষা নয়, ১৫ দিনের মধ্যে ফের পরীক্ষা

২

ধুনটে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

৩

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে রাজনৈতিক প্রভাব নেই – এমপি মোশারফ হোসেন

৪

বগুড়ায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উদযাপন করেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

৫

শারদীয় দুর্গোৎসবে সরকারি খাদ্যসহায়তা, পূজামণ্ডপপ্রতি ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দিলেন এমপি বাচ্চু মোল্লা

৬

নারীরা কথা বলবেন, কিন্তু নিরাপদ থাকবেন তো?

৭

নিয়োগপত্রের দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে ৮৩ প্রার্থীর আমরণ অনশন

৮

চকবাজারে মুনসুর খান টাওয়ারে আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা

৯

বগুড়ায় মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার তাগিদ

১০

নন্দীগ্রামে তথ্য সংগ্রহ অবহিতকরণ ও কন্যা শিশু দিবসে আলোচনা

১১

পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে শাহজাহানপুরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের সৌন্দর্যবর্ধন শুরু

১২

পুরান ঢাকার চকবাজারে মার্কেটে আগুন, নেভাতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

১৩

বগুড়ায় ৩০ গ্রাম গাঁজাসহ ৩ জন গ্রেফতার, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ দিনের কারাদণ্ড

১৪

সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থী

১৫

আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার ছাড়াই চালকল পরিচালনা, সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তে মিলল সত্যতা

১৬

ধুনটে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও সোনার চেইন ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৪

১৭

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান ফটক থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দিল পুলিশ

১৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হলে জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট

১৯

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৪০ বছর করার দাবি, নিয়োগে স্বচ্ছতা চান চাকরিপ্রত্যাশীরা

২০