
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের পানিবৃদ্ধিতে দুই ইউনিয়নের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও পাটখেত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি আরও ৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বন্যার পানিতে অনেক পরিবারের ঘর ও আঙিনা তলিয়ে যাওয়ায় রান্না ও বসবাসে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। পানির সঙ্গে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
বন্যায় চরাঞ্চলের বিপুল পরিমাণ পাটসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এ ছাড়া দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, বন্যাকবলিত প্রায় ১ হাজার ৬০০ পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল এবং ২৫০ পরিবারের জন্য ডাল, তেল, লবণসহ শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক শত পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় বর্তমান সহায়তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা পর্যাপ্ত চাল ও শুকনো খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, চিকিৎসাসেবা, গোখাদ্য এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা জানান, গত চার থেকে পাঁচ দিনের বন্যায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। দুই ইউনিয়নের বহু ঘরবাড়ি ও ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ২ লাখ টাকা ও ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ৮ টন চাল বরাদ্দ আসার কথা রয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় এ সহায়তা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সংসদ সদস্য জরুরি ভিত্তিতে আরও অন্তত ২০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নষ্ট ফসলের ক্ষতিপূরণ, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং বানভাসি মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
এদিকে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। দুর্গত এলাকায় দ্রুত মেডিকেল টিম পাঠানো, সাপের কামড়ের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং গোখাদ্য বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পদ্মার পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্গত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা।
মন্তব্য করুন