তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
৫ মে ২০২৬, ১:৩৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দিশেহারা কৃষকরা, অথৈ পানির নিচে সোনালী স্বপ্ন

Share this news with

মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাতের কবলে পড়েছে হাকালুকি হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, হাইল হাওর সহ ছোট-বড় হাওরের হাজারও কৃষকের কষ্টার্জিত বোর ফসল। চোখের সামনে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে বুরো ধান। হাওর জুড়ে থৈ থৈ করছে শুধু পানি আর পানি। একদিকে অব্যাহত বৃষ্টি আর অপরদিকে পাহাড়ি ঢলে পানি বাড়ছেই হাওরে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানিতে ডুবে গেছে পাকা ধান। ধান কেটে নিয়ে আসার সুযোগও নেই। এমন পরিস্থিতিতে চোখের জলে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া অসহায় কৃষকের সামনে কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

মঙ্গলবার (৫ মে) শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের হাইল হাওর, জেলা সদরের গিয়াসনগর ইউনিয়নের বৌলার হাওর, বিন্নার হাওর ও মোস্তাপুর ইউনিয়নের খাইঞ্জার হাওর ও কাউয়াদীঘি হাওর ঘুরে দেখা গেছে পাকা ধান কাটার আগেই তা পানিতে তলিয়ে গেছে।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের কৃষকরা জানান, ধার-দেনা করে হাইব্রিজ জাতের ধান ফলিয়ে ছিলেন তারা, ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু মাত্র দুই কেয়ার জমিনের ফসল কেটে ৪৫-৫০ মণ ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। তবে রাতের বৃষ্টিতে সব পাকা ফসল বুকসম পানিতে ভেসে যায়।

হাওর এলাকার মেদিনীমহল, নিদনপুর, ধুলিজোড়া, জামুয়া, কেওলাসহ আশপাশ গ্রামের সাধারণ কৃষকদের ৮-১০ হাজার জমির ফসলও তলিয়ে গেছে। এ হাওরের উলাউলি, মাটিগোড়া, ফাটাশিঙা বিল এলাকায় চুক্তিবর্গা নিয়ে প্রায় ৫০ বিঘা জমি চাষ করেছিলেন ফতেপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামের সুজন মিয়া। হাওরের নিচু এলাকায় তার জমি হওয়ায় সে সব জমিতে আরও বেশি পানি থৈ থৈ করছে। তিনি জানান পাকনা ধান থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে পারছিলেন না। ৫-৬ কেয়ার ধান কাটার পর এক রাতের বৃষ্টিতে আগামীর স্বপ্ন মুখের গ্রাম ডুবে গেছে। যদি ২-৩ দিনের মাঝে পানি নেমে যায় তবুও কিছু ধান কেটে বাড়িতে আনা যাবে।

বিরইনবাজ গ্রামের বর্গা চাষী নজরুল ইসলাম জানান, কাউয়াদীঘি হাওরে ৮০ কিয়ার জমিতে বুরো ধান রোপণ করেছিলাম। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ১২ কিয়ার কর্তন করতে পারলেও এখন ৬৮ কিয়ার পাকা ধান পানিতে সম্পুর্ণ তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, শক্তি নামক এনজিও থেকে ৬ লাখ টাকা ধার নিয়ে এখন ধান তলিয়ে যাওয়ায় পথে বসার মতো অবস্থা।

একই এলাকার কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, ২০ কিয়ার জমিতে বর্গা চাষ করেছি। এখন সব পানির নিচে। কোনভাবেই কর্তন করে তোলে নিয়ে আসা সম্ভব হবেনা। তিনি বলেন, শুধু আমি একা না,আমার মতো কাউয়াদীঘি হাওরের আরও অনেক কৃষকের পাকা ধান এখন পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ দিকে কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষকরা জানান মনুপ্রকল্প এলাকার কাশিমপুর পাম্প হাউসের ৮টি মেশিন প্রতিদিন লাগাতার সেচ দিলে ২-৩ দিনের মধ্যে হাওরের পানি কমে যাবে। ফলে বেশ কিছু জমির ফসল কাটা যেতে পারে। এর বেশি দিন পানিতে ধান জমে থাকলে পঁচে যাবে। ফতেপুর ইউনিয়নের মোকামবাজার এলাকার কৃষক শামসুউদ্দিন জানান দীর্ঘদিন ধরে বুরবুরিয়া বিলসহ বিভিন্ন নালা খাল খনন না করায় ভরে গেছে। এতে স্বল্পমাত্রার বৃষ্টিতে হাওরের উঁচু এলাকার জমিতেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বৃষ্টির সাথে চারিদিকের পানি নামতে থাকে কাউয়াদীঘি হাওরে। পাম্প হাউস সেচ দিলেও প্রতিদিন আখালিয়া, উদনাছড়াসহ বিভিন্ন খাল বিল দিয়ে পানি আসায় সেচে দিলেও তিল তিল করে কমছে পানি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে সব সময় পাম্প হাউস সচল থাকে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন গত দুই তিনদিন ধরে বিদ্যুৎ সংকট না থাকায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাশিমপুরের সবগুলো পাম্প সচল রয়েছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি কমছেনা। পানি কমতে হলে বৃষ্টি থামার ৪ থেকে ৫দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্য বলছে, জেলায় ৬২ হাজার ৪শ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। তার মাঝে হাওর এলাকায় ৮২.৫ ভাগ ৩০ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। নন হাওর এলাকার আট হাজার ৬০ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে। এ হার ২৩%। কর্তনের গড় হার ৪৯%। জেলার বিভিন্ন হাওরে প্লাবিত হয়ে এক হাজার ১৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা আনুমানিক আট হাজার ৫০। তবে কাউয়াদীঘি, হাকালুকি, হাইল হাওর, কড়াইয়া, বড়হাওর, পূবের হাওর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছেন পানিতে ডুবে ও শিলা বৃষ্টিতে ২ থেকে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান সরেজমিন বোর আবাদ এলাকায় নিজে ঘুরে ও ৭টি উপজেলা কৃষি অফিসের সরেজমিন তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তরুণদের কণ্ঠ থেকে জলবায়ু নীতি: বাংলাদেশ কি শুনবে তরুণ জলবায়ু নেতাদের?

কিশোরগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ, ‘ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় প্রস্তুত’ থাকার ঘোষণা

দাউদকান্দিতে প্রাইভেটকারে মিলল ১০০ কেজি গাঁজা, পুলিশের অভিযানে চালক উধাও

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বিদেশি স্বার্থের প্রতিবাদে প্রেসক্লাব এলাকায় জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের বিক্ষোভ

নওগাঁয় ১৭ অক্টোবর শুরু হচ্ছে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট

অপরাধ ও দুর্নীতি নির্মূলে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা

ভূরুঙ্গামারীতে হোটেলে পুলিশের অভিযান, ৭ হাজার ইয়াবার তথ্য

পরাজিত শক্তির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করবে বগুড়া যুবদল

সান্তাহারে মিলারের বিরুদ্ধে খাড়ির পাড় দখল ও জমিতে বজ্র ফেলার অভিযোগ

বগুড়ায় ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ

১০

বগুড়ায় সন্ত্রাস নৈরাজ্যের প্রতিবাদে রেলস্টেশনে বিক্ষোভ মিছিল

১১

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আসামিদের পক্ষে লড়বেন না কোনো আইনজীবী

১২

২০২৭ এর মে থেকেই চট্টগ্রামে স্হায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করবে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি

১৩

জাবিতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং সামিট অনুষ্ঠিত

১৪

বগুড়ায় ১৪ হাজার ইয়াবাসহ যুবক আটক

১৫

দৌলতপুরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত সাবেক সেনা সদস্য

১৬

কুড়িগ্রামে সার বিতরণে বিলম্বের প্রতিবাদে কৃষকদের সড়ক অবরোধ, ঘণ্টাখানেক যান চলাচল বন্ধ

১৭

ঠাকুরগাঁও ভূল্লীতে ট্রাক-অটোর সংঘর্ষে কলেজছাত্রী নিহত, আহত ৬

১৮

বগুড়ায় যাত্রীবাহী বাসে সন্তান জন্ম, মা-শিশুর আজীবন ভ্রমণ ফ্রি

১৯

ভর্তি সহায়তায় বগুড়ার শাহ্ সুলতান কলেজে ছাত্রদলের হেল্পডেস্ক

২০