
জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির প্রস্তুতি বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, জনগণের বিভিন্ন দাবি এবং দেশের সার্বিক স্বার্থকে সামনে রেখে ১১ দল দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে জনগণের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু সামনে আসায় মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চ
হামিদুর রহমান আযাদ জানান, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে দ্বিতীয় লংমার্চ শুরু হবে। সকাল ৭টায় নেতাকর্মীদের জমায়েত এবং ৮টা পর্যন্ত উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে।
লংমার্চের পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পাঁচটি পথসভা করার কর্মসূচি রয়েছে। পরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।
তিনি বলেন, তাদের কর্মসূচির মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করা।
৬ দফা থেকে ৭ দফা দাবি
১১ দলের দাবির তালিকা এখন ছয় থেকে সাত দফায় উন্নীত হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নেতা। নতুন করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের বিষয়টি দাবিতে যুক্ত হয়েছে।
তার অভিযোগ, এসব অনিয়মের মাত্রা আগের সরকারের সময়ের পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গণভোটের রায় উপেক্ষার অভিযোগ
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সরকারের ভূমিকারও সমালোচনা করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তার দাবি, ১১ দলীয় জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুরু থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সংসদে অবস্থান নিয়েছেন।
কিন্তু সরকার গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বার্তা তৈরি করেছে।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকট নিয়ে সমালোচনা
দেশের তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিয়েও সরকারকে কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তার দাবি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গ্যাসের অভাবে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্প খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সার ও দ্রব্যমূল্য নিয়েও উদ্বেগ
সার সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন হামিদুর রহমান আযাদ। এর প্রভাব ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য পরিস্থিতির ওপর পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নজরদারিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ১১ দলীয় ঐক্যের এই সমন্বয়ক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও তোলেন।
তার দাবি, জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব বিষয়ে সংসদে আলোচনা এবং রাজপথে কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধীদলগুলো তাদের অবস্থান তুলে ধরছে।
জাতীয় ঐকমত্যের আহ্বান
দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তার অভিযোগ, বিরোধীদলগুলোর দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব সরকার যথাযথভাবে বিবেচনা করছে না।
তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন সংকটের সমাধান না হওয়ায় ১১ দলকে রাজপথে কর্মসূচি দিতে হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ের শেষ দিকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে কর্মসূচি সফল করতে দেশবাসীর প্রতি অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার আহ্বান জানান।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতৃবৃন্দ, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, জাগপা, বিডিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতারা। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইনও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন