
একসময় শুক্রবার মানেই ছিল এক অন্যরকম প্রশান্তি। সকালটা শুরু হতো একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে। মসজিদের মাইকে জুমার আজান ভেসে আসত, আর ঘরে রান্না হতো বিশেষ কিছু মুরগির ঝোল, খিচুড়ি কিংবা গরুর মাংস। দুপুরে টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ক্রিকেট, আর সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই মিলে গল্প সব মিলিয়ে শুক্রবার ছিল সম্পর্ক, ভালোবাসা আর মানসিক শান্তির দিন।
আজ সেই শুক্রবার যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। বর্তমান সমাজে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক বেশি শূন্য। শুক্রবার এখন আর পরিবারের দিন নয়; বরং এটি হয়ে গেছে ঘুম পূরণের দিন, মোবাইল স্ক্রল করার দিন কিংবা অফিসের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দিন। একই ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যরা যেন আলাদা আলাদা পৃথিবীতে বাস করছে। কেউ ফেসবুকে ব্যস্ত, কেউ ইউটিউবে, কেউ আবার অনলাইন গেমে ডুবে আছে। সম্পর্ক আছে, কিন্তু সংযোগ নেই; কথা আছে, কিন্তু আন্তরিকতা নেই।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় একটি কারণ হলো বর্তমান ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা। এখন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন হয় তার মানসিক শান্তি দিয়ে নয়, বরং সে কী ব্যবহার করে, কী পরে, কোথায় ঘুরতে যায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটা “পারফেক্ট” জীবন দেখাতে পারে এসব দিয়ে। মানুষ এখন সুখ অনুভব করার চেয়ে সুখ প্রদর্শনে বেশি ব্যস্ত।
আগের মানুষ কম পেয়েও বেশি সুখী ছিল। ছোট একটি ঘর, সীমিত আয়, সাধারণ জীবন—তবুও সম্পর্কের মধ্যে ছিল উষ্ণতা। শুক্রবারে পরিবার একসাথে বসে খেত, গল্প করত, আত্মীয়দের বাড়ি যেত। তখন মানুষ “সময়” দিত একে অপরকে। এখন আমরা দামি ফোন কিনি, বিলাসী জীবন চাই, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে এক ঘণ্টা বসে গল্প করার সময় পাই না।
একসময় জুমার নামাজ ছিল সামাজিক বন্ধনেরও একটি মাধ্যম। মসজিদে গিয়ে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো, কুশল বিনিময় হতো, সম্পর্ক আরও গভীর হতো। এখন অনেকেই নামাজ পড়েও দ্রুত ফিরে আসে নিজের ব্যস্ত জগতে। মানুষের ভেতরে ধৈর্য কমছে, সহমর্মিতা কমছে, বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা।
শিশুদের জীবনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে শুক্রবার বিকেলের মাঠগুলো শিশুদের হাসি আর চিৎকারে মুখর থাকত। এখন সেই মাঠের জায়গায় উঠেছে বহুতল ভবন। শিশুরা মাঠে দৌড়ানোর বদলে মোবাইলের স্ক্রিনে সময় কাটায়। তাদের শৈশব এখন ভার্চুয়াল, সম্পর্কগুলোও ডিজিটাল। ফলে তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও আবেগের জায়গায় ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে।
গ্রামের জীবনেও সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। আগে বিদ্যুৎ চলে গেলে হারিকেনের আলোয় গল্প হতো, পুকুরপাড়ে আড্ডা বসত, রাতগুলো কাটত মানুষের সান্নিধ্যে। এখন বিদ্যুৎ আছে, ইন্টারনেট আছে, আধুনিকতা আছে কিন্তু মন থেকে যেন হারিয়ে গেছে শান্তি। কারণ প্রযুক্তির আলো যত বেড়েছে, সম্পর্কের উষ্ণতা তত কমেছে।
বর্তমান সমাজ আমাদের শিখিয়েছে বেশি অর্জন করতে, কিন্তু কম অনুভব করতে। আমরা এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভোগ করি, কিন্তু কম কৃতজ্ঞ হই। আমাদের ঘরে জিনিসপত্র বেড়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি সময় আর মনোযোগ কমেছে। এই ভোগবাদী দৌড়ে মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে নিজের ভেতরের সরলতা।
তবুও আশার জায়গা আছে। আমরা চাইলে আবার কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পারি সেই হারিয়ে যাওয়া শুক্রবারের অনুভূতি। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারকে সময় দেওয়া, সন্তানদের মাঠে নিয়ে যাওয়া, একসাথে খাওয়া, কিছু সময় প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা এসব ছোট ছোট উদ্যোগ ফিরিয়ে আনতে পারে সম্পর্কের উষ্ণতা।
কারণ জীবনের সত্যিকারের সৌন্দর্য বিলাসিতায় নয়; তা লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট সাধারণ মুহূর্তে। আধুনিকতার দৌড়ে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু হারিয়েছি কিছু নিঃস্বার্থ সুখ। তাই এখনও সময় আছে নিজেদের জীবনে আবার একটু “শুক্রবার” ফিরিয়ে আনার।
মন্তব্য করুন