
বাজারে যাওয়ার আগে দুবার ভাবতে হয় তাঁদের। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ও। শুধু বাড়েনি তাঁদের মাসিক বেতন বা সম্মানী। বগুড়ার ধুনট উপজেলার মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবন যেন এই একমুখী কঠিন সমীকরণেই আটকে আছে।
একদিকে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার, অন্যদিকে বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকা সামান্য সম্মানী—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হয়ে চলছে তাঁদের সংসার। আর্থিক অনটনের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে। ফলে অনেকের পক্ষেই ধর্মীয় এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে আগের মতো পূর্ণ একাগ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সময়ের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পেশার মানুষের বেতন-ভাতা বাড়লেও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য নেই কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি বেতন কাঠামো। মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত ও সামর্থ্যের ওপরই নির্ভর করে তাঁদের মাসিক সম্মানী। ফলে একই উপজেলার একেক মসজিদে বেতনের পার্থক্যও রয়েছে ব্যাপক।
চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা গ্রামের একটি মসজিদের ইমাম মো. আব্দুর রহমানের কথাতেই ফুটে ওঠে এই বাস্তবতা। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে চাঁদা তুলে মাস শেষে তাঁকে দেওয়া হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। অনেক সময় সেই টাকাও হাতে আসে দুই মাস পর।
স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। আব্দুর রহমান বলেন, ‘ষসংসারে স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে সংসার চলে না। প্রতি মাসেই ধারদেনা বাড়ছে।
পৌরসভার খাদ্য গুদামসংলগ্ন একটি মসজিদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুয়াজ্জিনের অবস্থাও একই। তাঁর মাসিক বেতন মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা।
তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই সবজি বা ডাল খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছি। সবজি কেনাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারদেনার চাপ বাড়ছে।
অথচ এই পেশায় ছুটি বলে যেন কিছু নেই। ঝড়-বৃষ্টি, কনকনে শীত কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাঁদের দায়িত্ব পালনে বাধা হতে পারে না। প্রতিদিন ভোরে আজানের সুরে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা থেকে শুরু করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি—সবই তাঁদের নিয়মিত দায়িত্ব। অথচ দিনের শেষে তাঁদের নিজেদের ঘরেই জ্বলে অভাবের প্রদীপ।
এই সংকট শুধু দু-একটি মসজিদের নয়। ধুনট উপজেলার প্রায় প্রতিটি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও খাদেমের জীবনেই কমবেশি একই চিত্র।
উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ধুনটে মোট মসজিদের সংখ্যা ৭৯৭টি। এসব মসজিদে প্রায় ৭৯৭ জন ইমাম, ৭৭১ জন মুয়াজ্জিন, ৪৭০ জন খতিব এবং ৪৯০ জন খাদেম রয়েছেন। সব মিলিয়ে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২ হাজার ৫২৭ জন মানুষ।
কিন্তু তাঁদের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বেতন কাঠামো বা সর্বজনীন নিয়মনীতির ব্যবস্থা। মসজিদ কমিটির আর্থিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে তাঁদের বেতন বা সম্মানী।
কোথাও ৪ হাজার, কোথাও ৮ হাজার
অন্তত ৩০ জন ইমাম-মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক মসজিদে একজন ইমাম মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং একজন মুয়াজ্জিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পান।
শহর বা পৌর এলাকার কিছু মসজিদে ইমামদের বেতন তুলনামূলক বেশি। সেখানে সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পাওয়ার নজির রয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও করুণ। অনেক মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের দায়িত্বও একই ব্যক্তিকে পালন করতে হয়।
ফলে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে অনেকেই খুঁজে নিচ্ছেন বাড়তি আয়ের পথ। কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ টিউশনি করছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
ইমামতির পাশাপাশি অটোভ্যান চালান মিজানুর
চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের মধ্যপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মো. মিজানুর রহমানের জীবনযাপন যেন এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
ভোরের আঁধার কাটার আগেই মসজিদে গিয়ে আজান দেন তিনি। ফজরের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে খেজুরের গুড় ও আটার রুটি খেয়ে বেরিয়ে পড়েন অটোভ্যান নিয়ে। আর্থিক সংকটের কারণে ঋণ করে কেনা সেই অটোভ্যানই এখন তাঁর বাড়তি আয়ের প্রধান ভরসা।
জোহরের নামাজের আগে বাড়ি ফিরে সামান্য বিশ্রাম, গোসল ও খাবার শেষে আবার ছুটে যেতে হয় মসজিদে। এভাবেই ইমামতি ও জীবিকার দ্বৈত লড়াইয়ে কেটে যাচ্ছে তাঁর প্রতিটি দিন।
এলাঙ্গী ইউনিয়নের শৈলমারী জামে মসজিদের ইমাম মুফতি শাহাদাতও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে আমরা অনেক কষ্টে আছি। দিন দিন যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে, জানি না কীভাবে জীবনযাপন করব। সব কিছুর দাম বাড়লেও আমাদের বেতন তো আর বাড়ছে না।
তবে পুরো চিত্রটাই অন্ধকার নয়। ধুনট উপজেলার একমাত্র কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের বেতন তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।
সেখানে একজন ইমাম সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন সাড়ে সাত হাজার টাকা এবং খাদেম সাত হাজার টাকা বেতন পান। মসজিদটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হওয়ায় এখানে বেতন কাঠামোতেও রয়েছে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা।
তবে এই মসজিদের ইমাম আব্দুল বাসেতকেও সংসার চালাতে ইমামতির পাশাপাশি শিক্ষকতা করতে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদের মুয়াজ্জিন কাম খাদেম মো. ইসমাইলের বেতন সাত হাজার টাকা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে এই অর্থও তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। মুয়াজ্জিনের পেশার বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো আয়ের পথ না থাকায় পুরোপুরি মসজিদ কমিটির বেতনের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। মাস শেষে হিসাব মেলাতে না পেরে ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় কাটে তাঁর রাত।
অন্ধকারের মধ্যে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত ইমামদের ক্ষেত্রে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ধুনটে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন ইমাম এই কার্যক্রমের আওতায় থেকে ইমামতির বেতনের বাইরে প্রতি মাসে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই অতিরিক্ত অর্থ তাঁদের অনেকের সংসার চালাতে কিছুটা সহায়তা করছে।
উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মীর আরিফুল ইসলাম জানান, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন ইমাম মাসে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। পাশাপাশি বাকি ইমামদেরও সরকারের মাসিক ভাতা কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে উপজেলার ১৬০টি মসজিদ ভাতার আওতায় এসেছে। ধাপে ধাপে বাকি মসজিদগুলোও এই কার্যক্রমের আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ধুনট ইমাম সমিতির সভাপতি মো. আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা ইমাম, সবার নেতা। অথচ এই নেতার খোঁজ কেউ রাখে না। বিভিন্ন সময় সরকার অনুদান দেয়, কিন্তু আমাদের ইমামদের কেউ সাহায্য করে না।
তিনি আরও বলেন, এলাকার জনপ্রতিনিধিরা চাইলে অসচ্ছল ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তা বা চালের কার্ডের ব্যবস্থা করতে পারেন। এটি তাঁদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে।
ধুনটে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আল খিদমাহ কওমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মুফতি আশেকে এলাহী শিবলী বলেন, ইমামরা সব সময় মানুষের পাশে থাকেন এবং ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোকন নামাজ আদায়ে মানুষকে সহযোগিতা করেন। অথচ দিন শেষে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হন।
তিনি বলেন, ‘আমরা ধুনটে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্য ও তাঁদের সার্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। মসজিদ কর্তৃপক্ষকে সচেতন করা গেলে এসব বিষয় আরও সহজ হবে এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতনও উন্নত হবে বলে আমরা আশা করি।
ইমাম-মুয়াজ্জিনরা শুধু একটি মসজিদের কর্মী নন; তাঁরা একটি এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের ওপর নির্ভর করেন মসজিদের মুসল্লি, শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষ।
কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের আয় যদি বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকে, তাহলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনযাত্রায় সংকট আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
ধুনটের বাস্তবতা বলছে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, নিয়মিত বেতন প্রদান এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সমাজকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে আসা এই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন