
উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা মিলিয়ে লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার রোগী সেবা নেন এই ৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে। কিন্তু টানা তাপপ্রবাহ ও ডেঙ্গুর প্রকোপে সাম্প্রতিক সময়ে রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ, আর দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে সেই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ দিনে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও গরমজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১২১ জন এর মধ্যে ডায়রিয়ায় ৬৭ জন, ডেঙ্গুতে ৪১ জন এবং পানিশূন্যতা, পেটব্যথা, জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আরও ১৩ জন। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৬৭ জন রোগী, যা ৫০ শয্যার ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি। ফলে শয্যা না পেয়ে অনেককে থাকতে হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়, যেখানে নেই বৈদ্যুতিক পাখারও ব্যবস্থা। হাসপাতালে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো জেনারেটরও নেই, ফলে লোডশেডিং হলে তীব্র গরমে কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায় রোগীদের।
বারান্দায় থাকা এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, তিনদিন ধরে আমাকে বারান্দায় রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ নেই, ফ্যানও নেই। গরমে আর পেটব্যথায় একেবারে নাকাল অবস্থা। একটু ভালো জায়গা আর চিকিৎসার ঠিকঠাক ব্যবস্থা করলে সুস্থ হতে পারতাম।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিন দিন ধরে ভর্তি থাকা আন্ডারবাড়ির সোহান (১৮) বলে, “মোটামুটি চিকিৎসা চলছে, কিন্তু বিভিন্ন রোগী একই সঙ্গে ওয়ার্ডে থাকার কারণে নিজের সুস্থতা নিয়ে শঙ্কিত রয়েছি। ডেঙ্গু-ডায়রিয়া সব রোগী একসঙ্গেই রাখা হচ্ছে। বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম জানান, ওয়ার্ডের পাশে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালের নিচে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদের রোগী রেখে সেই কষ্ট করতে হয় স্বজনদের।
এই সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি। জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও আরএমওসহ ৩৩টি পদের ১৫টি এবং জুনিয়র বিশেষজ্ঞের ১০টি পদের ৬টি শূন্য, জরুরি বিভাগেও নেই কোনো নির্ধারিত চিকিৎসক। ফলে বহির্বিভাগে শিশুসহ বিভিন্ন বিভাগে রোগী দেখছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তারা। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংকট আরও ভয়াবহ—১০৭টি তৃতীয় শ্রেণির পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৬৭ জন, আর ২৯টি চতুর্থ শ্রেণির পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৭ জন। হাসপাতালে নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওটি বয়, ওয়ার্ড বয়, টিকিট ক্লার্ক কিংবা নিরাপত্তা প্রহরীও।
জনবল ও সুযোগ সুবিধার এই সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল রোগীদের প্রায়ই রেফার করতে হয় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে, কখনো কখনো যেতে হয় বেসরকারি ক্লিনিকেও। অভিযোগ আছে, ওয়ার্ডে দিনে একবারই আসেন চিকিৎসক, ডাকলেও সহজে পাওয়া যায় না নার্সদের। ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ভর্তি রোগীদের দিনে একাধিকবার চিকিৎসক-নার্সের রাউন্ডের।
এ বিষয়ে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) মো. নাজমুল হোসেন বলেন, “এখানে গড়ে প্রতিদিন আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে ৪০০-৫০০ রোগী সেবা নেন। দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া না হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা জনবল সংকট তৈরি হয়েছে, তবে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না। শুধু আশঙ্কাজনক রোগীদের অন্যত্র রেফার করা হয়, বাকি সবাইকে ভর্তি রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।” ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া রোগীদের একসঙ্গে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “এটা কোনো সমস্যা হবে না, আমরা পৃথকভাবে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। জায়গার স্বল্পতার কারণে সাময়িকভাবে এভাবে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বাইরে চিকিৎসাধীন কাউকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, আপাতত বাইরে কোনো রোগী নেই।
তবে এ বিষয়ে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদুল কাদির কে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি এবং তার অফিসিয়াল ও ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
মন্তব্য করুন