
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই ২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল খনন প্রকল্প চালুর দাবিতে নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মো. আনোয়ার সাদাত। সমাবেশ পরিচালনা করেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক কালিমুল্লাহ ইকবাল ও যুগ্ম সম্পাদক ডা. বোরহান অরণ্য।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের নদ-নদী রক্ষা, পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এ জন্য গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তাঁরা।
গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গা চুক্তি নবায়নের দাবি
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা-পদ্মা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। সরকার ডিসেম্বরের মধ্যেই চুক্তি নবায়নের বিষয়ে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সম্পাদিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির আদলে নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পানি, কৃষি, পরিবেশ, জ্বালানি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই চুক্তি নবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তাঁদের মতে, শুধু চুক্তি সম্পাদন করলেই হবে না; বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নের কার্যকর নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
অভিন্ন ২২১টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২২১টি অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা সমঝোতা সম্পাদনের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান সমাবেশের বক্তারা।
তাঁরা বলেন, এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ, জ্বালানি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পগুলো যেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদে আয় সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের অন্যান্য বড় অভিন্ন নদীতেও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল খননের উদ্যোগ দ্রুত শুরুর আহ্বান
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি, সুপেয় পানির আধার তৈরি, খরা মোকাবিলা এবং সেচসুবিধা সম্প্রসারণে নদ-নদী ও খাল খনন এবং পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগকে তাঁরা স্বাগত জানান।
তবে খননকাজ শুরুর আগে নদী দখল ও দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তাঁরা। বক্তারা বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চিহ্নিত নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে।
একই সঙ্গে নদীদূষণে জড়িত শিল্পকারখানা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা। নদীদূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (ETP) স্থাপনে বাধ্য করা এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকিরও আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দখল-দূষণ বন্ধ করা না গেলে এসব উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সমাবেশ থেকে নদী রক্ষায় সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্পসহ নদী খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই দৃশ্যমানভাবে চালুর আহ্বান জানানো হয়। এসব দাবি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
মন্তব্য করুন