এহসানুল হক (জুবাইর), গোবিপ্রবি প্রতিনিধি
২৭ মে ২০২৬, ৪:২৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ক্যাম্পাস টু হোমটাউন: গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের কুরবানী ঈদের জল্পনা-কল্পনা

Share this news with

ল্যাব খাতার শেষ পাতাটা জমা দিয়ে, অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন পার করে কিংবা ক্লাসের চেনা আড্ডাটাতে একটু জলদিই ইতি টেনে এখন সবার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) বাতাসে এখন শুধুই ক্লাস-পরীক্ষার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে বাড়ি ফেরার সুবাস। উপলক্ষ—সামনে থাকা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র কুরবানী ঈদ।

ক্যাম্পাসের পিচঢালা পথ, ক্যাফেটেরিয়া কিংবা চেনা লেকের পাড়—সবখানেই এখন ঈদের ছুটির আমেজ। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই ঈদ উৎসব মানে শুধু এক টুকরো আনন্দ নয়; এর পেছনে থাকে বাড়ি ফেরার তীব্র ব্যাকুলতা, যাতায়াতের ঝক্কি আর ক্যাম্পাস জীবনের নানা রঙের অনুভূতি। গোবিপ্রবির বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের কুরবানী ঈদের এই বিচিত্র ভাবনা ও প্রস্তুতি নিয়েই আজকের এই আয়োজন।

১.প্রথমবার পরিবার ছাড়া ঈদের আমেজ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছরটা সবসময়ই একটু অন্যরকম অনুভূতির ছোঁয়া দিয়ে যায়। চেনা শহর, চেনা পরিবার ছেড়ে যারা প্রথমবার হলের চার দেওয়ালে কিংবা মেসের চিরচেনা নিঃসঙ্গতায় দিন কাটাচ্ছেন, তাদের জন্য কুরবানী ঈদের এই ছুটিটা যেন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি। প্রথমবার ক্যাম্পাস থেকে বাড়ি ফেরার টানটা কেমন, তা জানা গেল রিফাত হাসান এর কণ্ঠে। তিনি ফিসারিজ ও মেরিন বায়োসাইন্স বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

ছবি: রিফাত হাসান।

কুরবানি ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ যেমন হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তেমনি এই ঈদ মানুষকে শেখায় ভাগাভাগি করে নেওয়ার সৌন্দর্য। নিজের সামর্থ্য থেকে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য। তাই এই ঈদ শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু ঘরে ফেরার আনন্দই নয়, বরং ভালোবাসা, ত্যাগ ও মানবিকতার এক গভীর অনুভূতির নাম।

রিফাত হাসান
শিক্ষার্থী, ফিসারিজ ও মেরিন বায়োসাইন্স বিভাগ, গোবিপ্রবি

২.টিকিট যুদ্ধ আর দূরপাল্লার যাত্রা

ঈদ মানেই আনন্দের পাশাপাশি এক অলিখিত যুদ্ধ—টিকিট পাওয়ার যুদ্ধ। গোবিপ্রবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ বা দূর-দূরান্তের অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। তাদের জন্য এই উৎসবের আনন্দটা শুরু হয় বাসের কিংবা ট্রেনের টিকিট কাটার ধকল দিয়ে। দীর্ঘ যানজট আর পথের ক্লান্তি মাড়িয়ে বাড়ি পৌঁছানোর এই রোমাঞ্চকর ও কষ্টকর অভিজ্ঞতা নিয়ে বলছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: শিফাত হোসেন।

ছবি: মো: শিফাত হোসেন।

গোবিপ্রবিতে আমাদের উত্তরবঙ্গের অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। আমাদের জন্য উৎসবের আনন্দটা শুরু হয় ট্রেনের টিকিট কাটার চরম ধকল দিয়ে। ঈদের অন্তত ১০ দিন আগেই অনলাইনে যুদ্ধ করে টিকিট (ট্রেনের)কেটে রাখতে হয়, তা না হলে বাড়ি ফেরাটা আরো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে। টিকিট কাটার পর শুরু হয় মূল যাত্রা। গোপালগঞ্জ থেকে সরাসরি উত্তরবঙ্গের ট্রেন না থাকায় আমাদের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন ভেঙে ভেঙে যেতে হয়। তারপর ট্রেনে দীর্ঘ পথ—সব মিলিয়ে ক্লান্তি আর ধকলের শেষ থাকে না। দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গের এই দীর্ঘ দূরপাল্লার যাত্রা, ধুলোবালি আর পথের ক্লান্তি মাড়িয়ে বাড়ি পৌঁছানো—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা একাধারে কষ্টকর ও রোমাঞ্চকর। তবে দিনশেষে যখন ভাবি বাড়ি গিয়ে মা-বাবার সাথে ঈদ করব, তখন এই ১০ দিন আগে টিকিট কাটার টেনশন আর দীর্ঘ পথের সব ক্লান্তি এক নিমেষেই আনন্দের রূপ নেয়।

মো: শিফাত হোসেন
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোবিপ্রবি

৩.মেস-হলের হিসাব আর ‘অগ্রিম ঈদ’

ছুটি শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে মেস বা হলগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। ফ্রিজ খালি করা, খালাদের ছুটি দেওয়া, মেসের বাকি-বকেয়া হিসাব মেলানোর মতো টুকটাক হাজারো ব্যস্ততা থাকে মেস ম্যানেজার কিংবা হল আবাসিকদের। তবে বাড়ি যাওয়ার ঠিক আগের রাতে বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোটখাটো উৎসব বা ‘অগ্রিম ঈদ পুনর্মিলনী’ না করলে যেন চলেই না। মেসের এই ঈদের আমেজ নিয়ে বলছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাসিন জায়েফ।

ছবি: তাসিন জায়েফ।

মেসের রান্নাঘরে শেষবারের মতো একসাথে খাওয়া, হাসি-ঠাট্টা ও স্মৃতি রোমন্থনে ভরে ওঠে পরিবেশ। পরদিন সকাল থেকেই শুরু হয় বিদায়ের পালা — কেউ ট্রেনে, কেউ বাসে, কেউ রাতে, কেউ সকালে যায়। কেউ বন্ধুকে স্টেশনে পৌঁছে দেয়, আবার কেউ কেউ একসাথে বাড়ির পথে রওনা দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝে কুরবানির ঈদ নিয়ে আসে আপন নীড়ে ফেরার গভীর টান। মেসের এই ছোট আমেজ থেকে শুরু করে স্টেশনের বিদায় — সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে ত্যাগ, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের অনন্য প্রকাশ। এই মিলন-বিচ্ছেদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে কুরবানির ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য।

তাসিন জায়েফ
শিক্ষার্থী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গোবিপ্রবি

৪.পরীক্ষার চাপ ও ঈদের ছুটিতে ‘অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা’

অনেক সময় ঈদের ছুটির ঠিক পরপরই ক্যাম্পাসে সেমিস্টার ফাইনাল বা মিডটার্ম পরীক্ষার ডেডলাইন থাকে। ফলে ঈদের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করার মাঝখানে একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পড়ার টেবিলের চিন্তা। উৎসব ও পড়াশোনার এই দোটানা নিয়ে বলছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: আল আমিন হোসেন।

ছবি: মো: আল আমিন হোসেন।

ঈদের ছুটি ঘোষণা হলেও মনের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। কারণ ছুটি শেষ হলেই আমাদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। ব্যাগ গোছানোর সময় কাপড়ের চেয়ে ল্যাব খাতা আর নোটের ওজনই বেশি মনে হচ্ছে। ইচ্ছা আছে বাড়িতে গিয়ে ঈদের দিনটা সম্পূর্ণ পরিবারের সাথে কাটিয়েই আবার পড়ার টেবিলে বসতে হবে। উৎসবের আনন্দ আর পরীক্ষার চাপ—দুটোকে ব্যালেন্স করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।সবার ঈদ ভালো কাটুক। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।

মো: আল আমিন হোসেন
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোবিপ্রবি

৫.কুরবানীর পশুর হাটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আসার পর অনেক শিক্ষার্থীর কাঁধেই প্রথমবার পরিবারের বড় কোনো দায়িত্ব পড়ে। মেস বা হলের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ি গিয়ে বাবার সাথে পশুর হাটে যাওয়া, দামাদামি করা বা কুরবানীর দায়িত্ব নেওয়াটা অনেকের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই রূপান্তর নিয়ে বলছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুনতাসির বিল্লা বিজয়।

ছবি: মুনতাসির বিল্লা বিজয়।

ছোটবেলায় কুরবানী ঈদ মানে ছিল শুধু আনন্দ আর নতুন জামা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর নিজেকে কিছুটা পরিণত মনে হয়। এবার বাবা আগেই বলে রেখেছেন, হাটে গিয়ে গরু পছন্দ করার দায়িত্বটা আমার। পড়াশোনার জন্য সারা বছর তো বাইরেই থাকি, তাই ঈদের এই সময়টাতে হাটে যাওয়া বা কুরবানীর সব কাজ নিজ হাতে করে বাবার কষ্টটা একটু লাঘব করতে পারাটাই আমার কাছে এখন বড় আনন্দের।আল্লাহ তায়া’লা সবার কুরবানি কবুল করুক।আমিন।

মুনতাসির বিল্লা বিজয়
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোবিপ্রবি

ক্যাম্পাসের হল বা মেসের রুমগুলোতে একে একে ঝুলছে তালা। ক্যাম্পাস থেকে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে গোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। যাতায়াতের শত ভোগান্তি কিংবা ক্লান্তিকে এক নিমেষেই মুছে দিচ্ছে নাড়ির টান। সকল ব্যস্ততা আর জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের এই ঈদ যাত্রা হোক নিরাপদ ও আনন্দময়। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠুক প্রতিটি শিক্ষার্থীর কুরবানী ঈদ।

  • প্রধান কার্যালয়: ২৪১/১-বি (হক ট্রেডার্স), তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি - তেজগাঁও লিঙ্ক রোড), তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
    নিউজ রুম: ০১৭৪৬-৭৪৫১২৫
    প্রতিষ্ঠাকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৪ ইংরেজি।
    ই-মেইল: pressdeskbd@gmail.com

    View all posts
Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নোয়াখালীতে ‎জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করলেন এমপি শাহজাহান

১

দেড় মিনিটে মন্ত্রীকে ২৫ বার ‘স্যার’, সেই ইউএনও আবারও আলোচনায়

২

গুলশানে মার্কিন নাগরিকের অস্বাভাবিক আচরণ, দূতাবাসে নেওয়ার তথ্য

৩

ধুনট উপজেলা প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি ঘোষণা, সভাপতি লিখন ও সম্পাদক রাকিবুল

৪

অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জন, কুড়িগ্রামে শেষ হলো দুর্গোৎসব

৫

অতিরিক্ত ক্লাসের আড়ালে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, গ্রেপ্তার মাদ্রাসাশিক্ষক

৬

বগুড়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারে ডিএনসিকে দুই মোটরসাইকেল দিল চেম্বার

৭

কক্সবাজারে সাগরে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন, ৪৫ মিনিটে বিদায় ৩৮০ প্রতিমার

৮

শেরপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা দিলেন শহিদুল ইসলাম

৯

লাকসামের নাওটি স্টেশনে কর্ণফুলী কমিউটারের চার বগি লাইনচ্যুত

১০

বাংলাদেশ লেবার পার্টির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলোচনা সভা

১১

আদমদীঘিতে সাইবার সুরক্ষা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গ্রেফতার

১২

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ

১৩

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কনস্যুলার সুরক্ষার ঘাটতি কোথায়?

১৪

আতঙ্ক কাটিয়ে লালন আখড়াবাড়িতে জনস্রোত, শেষ হলো স্মরণোৎসব

১৫

দুই বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় সৌদি আরবকে লাল কার্ড দেখাল ছাত্র ফেডারেশন

১৬

ধুনটে স্ত্রীকে বিয়ে করায় বন্ধুর ছুরিকাঘাতে বন্ধু হাসপাতালে

১৭

ষড়যন্ত্র থেমে নেই—দুর্গাপূজা নিয়ে নোয়াখালীতে বিস্ফোরক মন্তব্য ছাত্রদল নেতার

১৮

নিজ অর্থায়নে জাবির মুক্তমঞ্চে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন

১৯

তিন দিনের লালন উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছেঁউড়িয়ায় উৎসবের আমেজ, রাতভর বাউলগান

২০