
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব শেষ হয়েছে। উৎসবের শেষ দিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় লালন আখড়াবাড়ি ও মাজার এলাকায় ভক্ত-দর্শনার্থীদের ঢল নামে। আগের রাতে আখড়াবাড়ির ভেতর থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্বেগ কাটিয়ে আবারও মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বাউল সাধনার ঐতিহ্যবাহী এই তীর্থস্থান।
শনিবার সন্ধ্যায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসবের উদ্বোধন করেন। সরকারি আয়োজনের পাশাপাশি লালন অনুসারী ভেকধারী বা খিলাফতধারী শিষ্য বাউলরা নিজস্ব রীতিনীতি অনুসারে সাধনা ও আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শনিবার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া তাঁদের অষ্টপ্রহরব্যাপী আয়োজন রবিবার বিকেলে পূর্ণসেবা বা মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর অনেক সাধু ও বাউল আখড়াবাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও সাধারণ ভক্ত-দর্শনার্থীদের অনেকে উৎসবের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।
এরই মধ্যে রবিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে আখড়াবাড়ির ভেতরের অংশ থেকে একটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এতে সেখানে অবস্থানরত বাউল ও ভক্তদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। সোমবার ভোর থেকে অনেকেই আখড়াবাড়ি ছেড়ে যেতে শুরু করেন। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলে সাধারণ ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আবারও সেখানে আসতে থাকেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে লালন মাজার, আখড়াবাড়ির আশপাশ এবং বাইরের মাঠে মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
মানিকগঞ্জ থেকে আসা লালনভক্ত হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংসের অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। বাংলা সংস্কৃতি সহ্য করতে পারে না, এমন কোনো পক্ষ এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
উৎসবে আসা কয়েকজন দর্শনার্থীও আখড়াবাড়ির ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, এ ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান। তবে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সোমবার বিকেলে লালন আখড়াবাড়ির স্থায়ী মঞ্চে স্মরণোৎসবের সমাপনী দিনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় লালনসংগীত পরিবেশনা। বাউল শিল্পীদের কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মতত্ত্বের গান উপভোগ করেন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় এবারের তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব।
লালন সাঁইয়ের গান ও দর্শন বাংলার লোকসংস্কৃতি, মানবপ্রেম এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। এবারের উৎসবে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হলেও শেষ দিনে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লালনসংগীত ও সাধনধারার প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগের প্রকাশ ঘটিয়েছে।
স্মরণোৎসব শেষ হলেও এখন থেকেই আগামী ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত দোল উৎসবের অপেক্ষায় থাকবেন সাধু-গুরু, বাউল ও লালনভক্তরা। সেই আয়োজন ঘিরে আবারও ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে মিলিত হবেন দেশ-বিদেশের অনুসারীরা।
মন্তব্য করুন