বগুড়ার ধুনটে সম্প্রতি শিয়ালের উপদ্রব উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ক্ষুধার্ত ও হিংস্র শিয়াল দলবদ্ধভাবে লোকালয়ে ঢুকে হাঁস-মুরগি ধরে খাওয়ার পাশাপাশি পথচারীদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এমনকি উপজেলায় দিনের বেলাতেও গৃহপালিত পশুর ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৮ থেকে ৯ জন পথচারী ও কৃষক শিয়ালের কামড়ে আহত হয়েছেন। এতে করে উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।বিশেষ করে গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় শিয়ালের উপদ্রব বেড়ে গেছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ঝোপঝাড় থেকে দলবেঁধে বের হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে ক্ষুধার্ত ও হিংস্র শিয়াল। এ কারণে অভিভাবকরা বিকেল হলেই শিশুদের ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করছেন।
চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী এলাকার বাসিন্দা হাফিজুল্লাহ খন্দকার জানান, ক্ষুধার্ত শিয়ালগুলো বাড়িতে ঢুকে হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে যাচ্ছে। খোঁয়াড় (নিরাপত্তা বেষ্টনী) বন্ধ করে রাখার পরেও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না শিয়ালের হাত থেকে। মথুরাপুর ইউনিয়নের গৃহিণী সুমি খাতুন জানান, বাড়িতে আমরা নিজেদের জন্য হাঁস-মুরগি লালন পালন করে থাকি। কিন্তু শেয়ালের উপদ্রবে সেগুলো লালন-পালন করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। গোসাইবাড়ী এলাকার সালাম শেখ বলেন, প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাবেই শিয়াল লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আগে কিছুটা উপদ্রব থাকলেও এখন তা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। যার কারনে শিয়ালের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন সাধারন মানুষ।
ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শিক্ষার্থী সানজিদা মিম জানায়, দূর থেকে স্কুলে যাতায়াতের পথে নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে আসতে ভয় লাগে। শিয়াল সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। ফরিংহাটা এলাকার বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী মাওলানা রবিউল ইসলাম জানান, গত সপ্তাহে রাতে বাড়ি ফেরার পথে শিয়ালের দল গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। শুধু তাই নয় গত শুক্রবার দুপুরে পৌর এলাকার জিঞ্জিরতলা গ্রামের ভুট্টাক্ষেত থেকে বের হওয়া একটি শিয়ালের আক্রমণে বাচ্চু মিয়া (৫৫) নামে এক কৃষক আহত হয়েছেন। তিনি গরুর জন্য ঘাস কাটার সময় শিয়ালের মুখোমুখি হন। আত্মরক্ষার্থে কাস্তে দিয়ে প্রতিরোধ করলেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড়ে গুরুতর জখম করে। স্থানীয় কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, এলাকায় ভুট্টা চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিয়ালগুলো সহজেই আশ্রয় পাচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। সন্ধ্যার পর আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কগুলো শিয়ালের চলাচলের পথে পরিণত হয়েছে।
শিয়ালের উপদ্রবের কারণে উপজেলা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকলেও চতুর শিয়ালগুলো আক্রমণ করে দ্রুত পাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়ছে। কুকুর তাড়া করলেও উল্টো কুকুরের ওপরও আক্রমণ করছে শিয়ালের দল।
ধুনট উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন টিক্কা বলেন, সাধারণত খাদ্যের অভাব দেখা দিলেই সন্ধ্যা বা রাতে শিয়াল লোকালয়ে আসে এবং জঙ্গলে খাবার না পেলে হাঁস-মুরগি শিকার করে। তিনি আরও জানান, দেশে সাধারণত পাতিশিয়াল ও খেঁকশিয়াল প্রজাতি বেশি দেখা যায়, যা দেখতে অনেকটা দেশি কুকুরের মতো। শিয়াল প্রকৃতির জন্য উপকারী প্রাণী। এরা ইঁদুর, পোকামাকড় ও মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু প্রাকৃতিক খাদ্য সংকট ও ইঁদুর-পোকামাকড় কমে যাওয়ায় এসব প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।
এ বিষয়ে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মির্জা শরিফুল ইসলাম বলেন, শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিষেধক নিতে হবে। বর্তমানে হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকলেও জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
মন্তব্য করুন