
“আমি আগে খুব ভালো ছিলাম, কিন্তু মানুষের ধোঁকা আমাকে বদলে দিয়েছে।” — এই বাক্যটি আমরা প্রায়ই শুনি। কেউ বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে বলে, কেউ প্রিয়জনের অবহেলায় বলে, আবার কেউ নিজের ভুল আচরণের ব্যাখ্যা হিসেবেও বলে। কথাটি শুনতে আবেগপূর্ণ এবং অনেকাংশে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও গভীরভাবে চিন্তা করলে প্রশ্ন জাগে— সত্যিই কি অন্যের ধোঁকা একজন মানুষকে খারাপ বানিয়ে দেয়, নাকি সে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রবণতারই একটি অজুহাত খুঁজে পায়?
বাস্তবতা হলো, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রায় সবাই প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, অবহেলা কিংবা অন্যায় আচরণের শিকার হয়। কারও বিশ্বাস ভেঙে যায়, কারও স্বপ্ন ভেঙে যায়, কারও হৃদয় ভেঙে যায়। এসব অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে একজন মানুষকে আঘাত করে, তার মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, মানুষ সম্পর্কে তার ধারণা বদলে দেয়। সে হয়তো আগের মতো সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, আগের মতো উদার হতে পারে না, কিংবা নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য সুরক্ষাবলয় তৈরি করে ফেলে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে— কষ্ট একজন মানুষকে সতর্ক করতে পারে, শক্ত করতে পারে, অভিজ্ঞ করতে পারে; কিন্তু তাকে অসৎ হতে বাধ্য করে না।
কারণ পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আছে যারা জীবনের সবচেয়ে কঠিন বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করেও নিজের সততা হারায়নি। তারা প্রতারণার শিকার হয়েছে, কিন্তু প্রতারক হয়নি। তারা অবহেলিত হয়েছে, কিন্তু অন্যকে অবহেলা করেনি। তারা কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু সেই কষ্টকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়নি। বরং তারা বুঝেছে, অন্যের ভুল আমার চরিত্র নির্ধারণ করবে না; আমি কেমন মানুষ হব, সেই সিদ্ধান্ত আমার নিজের।
দুঃখজনকভাবে অনেকেই নিজের অসততা, মিথ্যাচার, স্বার্থপরতা বা নিষ্ঠুরতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য অতীতের কষ্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা বলে, “আমার সাথে এমন হয়েছে, তাই আমিও এখন এমন।” অথচ এই যুক্তি গ্রহণ করা মানে নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। যদি অন্যের অন্যায় আমার অন্যায়কে বৈধ করে দেয়, তাহলে পৃথিবীতে কোনো অন্যায়েরই বিচার অবশিষ্ট থাকে না।
সত্যিকারের চরিত্রের পরিচয় তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজন মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের নীতিবোধ ধরে রাখতে পারে। ভালো থাকা তখনই মূল্যবান, যখন ভালো থাকার কারণ থাকে না; সৎ থাকা তখনই মহৎ, যখন অসৎ হওয়ার হাজারটা সুযোগ এবং অজুহাত সামনে থাকে।
মানুষের জীবনে কষ্ট আসবেই। কেউ আপনাকে ধোঁকা দেবে, কেউ আপনার বিশ্বাস ভাঙবে, কেউ আপনার সরলতার সুযোগ নেবে। সেই মুহূর্তে রাগ, অভিমান, হতাশা— সবকিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কষ্টকে নিজের চরিত্র ধ্বংসের লাইসেন্স বানিয়ে ফেলা কখনোই সমাধান নয়। কারণ ধোঁকা আপনাকে আহত করতে পারে, কিন্তু অসৎ বানাতে পারে না; সেই সিদ্ধান্তটি আপনাকেই নিতে হয়।
অনেক সময় আমরা লক্ষ্য করি, একজন ব্যক্তি বারবার বলে বেড়ায়— “মানুষ আমাকে বদলে দিয়েছে।” কিন্তু বাস্তবে মানুষ তাকে বদলে দেয়নি; সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বদলে যাওয়ার। কারণ একই পরিস্থিতিতে আরেকজন মানুষ হয়তো আরও মানবিক হয়েছে, আরও পরিণত হয়েছে, আরও নীতিবান হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনা নয়, ঘটনাকে ঘিরে নেওয়া সিদ্ধান্তই একজন মানুষের পরিচয় গড়ে দেয়।
জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয় প্রতিশোধে নয়, চরিত্রে। যে মানুষ ধোঁকা খেয়েও বিশ্বস্ত থাকে, অবহেলিত হয়েও মানবিক থাকে, কষ্ট পেয়েও অন্যকে কষ্ট দেওয়ার পথ বেছে নেয় না— প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী মানুষ সে-ই। কারণ সে প্রমাণ করে, তার নীতিবোধ পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল নয়।
কষ্ট মানুষকে কঠিন করতে পারে, অভিজ্ঞ করতে পারে, সতর্ক করতে পারে; কিন্তু অসৎ করে না। অসততা একটি সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ দায়ভার ব্যক্তির নিজের। তাই ধোঁকাকে অজুহাত নয়, শিক্ষা বানান; কারণ চরিত্র হারিয়ে জয়ী হওয়ার চেয়ে চরিত্র ধরে রেখে পরাজিত হওয়া অনেক বেশি সম্মানের।
মন্তব্য করুন