সর্বশেষ
||চট্টগ্রামে কোস্টগার্ডের তৎপরতা: চড়পাড়া ঘাটে অবৈধ ভোজ্যতেল উদ্ধার||চট্টগ্রামে সিএমপি ডিবির ঝটিকা অভিযান: ১৫০ রাউন্ড বিদেশি গুলিসহ ২ অস্ত্র ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার||লালমনিরহাট সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির সতর্কতা জারি||আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার ধুনটের উপজেলা চেয়ারম্যান খোকন||ঢাবির টিএসসিতে কক্সবাজার স্টুডেন্ট ফোরামের মিলনমেলা||ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও উগ্রবাদী সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন||কাপাসিয়ায় প্রবাসীর স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা||শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তী ঘিরে উৎসবের আমেজ, কুঠিবাড়িতে তিন দিনের জাতীয় আয়োজন||ঋণ বনাম সার্বভৌমত্ব: বৈশ্বিক অর্থনীতির বেড়াজালে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা||বিজিবি’র অভিযানে ভারতীয় গাঁজাসহ এক ম‌হিলা আটক

ঋণ বনাম সার্বভৌমত্ব: বৈশ্বিক অর্থনীতির বেড়াজালে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি যতটা না সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়, তার চেয়ে বেশি তৈরি করে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই গোলকধাঁধায় পা রাখা অনেকটা রূপকথার সেই ‘সোনার হরিণ’ ধরার মতো—যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিলেও দিনশেষে হাতের নাগালে ধরা দেয় কেবল একরাশ ঋণ আর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশের মতো একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশে এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: আমরা কি আমাদের নিজস্ব শক্তিতে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছি, নাকি উন্নয়নের উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিজাতীয় পুঁজির ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি যা আমাদের সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের ক্ষমতাকে খর্ব করছে?

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কখনোই একটি সমতল ক্ষেত্র ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনস (আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে। কিন্তু কালক্রমে এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতি নির্ধারক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, যেকোনো সংকটে—তা হোক কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার কিংবা ডলার সংকট আমাদের আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়।

​এই ঋণগুলো কখনো শর্তহীন হয় না। ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা কাঠামোগত সংস্কারের নামে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং কর বৃদ্ধির মতো এমন কিছু প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, এই উন্নয়ন কি সাধারণ মানুষের জন্য, নাকি দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি নিশ্চিত করার জন্য? যখন ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে টান পড়ে, তখন অর্থনীতির ‘ন্যায্যতা’ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়।

​গত এক দশকে বাংলাদেশে দৃশ্যমান উন্নয়নের এক জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো আমাদের অবকাঠামোগত চেহারা বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পেছনে রয়েছে বিশাল অংকের বৈদেশিক ঋণ। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বর্তমানে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। যদিও আমাদের জিডিপি-ঋণ অনুপাত এখনো অনেক দেশের তুলনায় নিরাপদ সীমার মধ্যে, কিন্তু ভয়ের জায়গাটি হলো ঋণের গুণগত মান এবং পরিশোধের সক্ষমতা।

​আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক ঋণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এই দেশগুলোর ঋণের শর্ত অনেক সময় অস্বচ্ছ থাকে এবং সুদের হারও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছাকাছি হয়। শ্রীলঙ্কার ‘হাম্বানটোটা বন্দর’ কিংবা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হলে উন্নয়ন কেবল বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি এই ঋণের টাকা দিয়ে এমন কোনো প্রকল্প নেয় যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের এই সুফল বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে।

​উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আমরা কি ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি? ডাব্লিউটিও এর মতো সংস্থাগুলো মুক্ত বাণিজ্যের কথা বললেও উন্নত দেশগুলো প্রায়ই ‘শুল্কবহির্ভূত বাধা’ বা ‘শ্রম মান’-এর অজুহাতে আমাদের বাজার প্রবেশাধিকার সীমিত করে।

​বাস্তবতা হলো, আমরা যে শার্টটি ২০ ডলারে আমেরিকায় রপ্তানি করি, তার সিংহভাগ মুনাফা ভোগ করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো। আমাদের কপালে জোটে কেবল সস্তা শ্রমের মূল্য এবং পরিবেশ দূষণের গ্লানি। এটিই হলো প্রবিশ-সিঙ্গার তত্ত্বের  আধুনিক সংস্করণ, যেখানে কাঁচামাল বা শ্রম সরবরাহকারী দেশগুলো দিনশেষে দরিদ্রই থেকে যায়, আর প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডের মালিকরা ক্রমাগত ধনী হতে থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই কাঠামোগত বৈষম্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে একটি ‘লো-ইনকাম ট্র্যাপ’-এ আটকে রাখছে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডলারের একাধিপত্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক প্রকার ‘জুলুম’। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ যখন তাদের দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ায়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের টাকায়। টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে, আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং আমাদের মতো দেশগুলোতে ‘ইম্পোর্টেড ইনফ্লেশন’ বা আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হয়। আমাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে চাল-ডালের বাড়তি দাম দিতে হয়। এই মুদ্রানীতির অসম প্রভাব প্রমাণ করে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র অর্থনীতির কোনো সুরক্ষা নেই।

​আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অন্যায় সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি, অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য। উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর জলবায়ু তহবিলে যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়, তা হয় অপর্যাপ্ত না হয় ঋণের আকারে আসে। অর্থাৎ, অন্যের করা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেও আমাদের ঋণ নিতে হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক চরম অনৈতিক দিক।

নির্ভরশীলতার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে কেবল সস্তা শ্রম বা ঋণের ওপর ভরসা করলে চলবে না, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতার ভিত গড়তে হবে। এর প্রধান শর্ত হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা; আমাদের জিডিপি-কর অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ের হওয়ায় নিজস্ব সম্পদ বাড়ানো ছাড়া ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি অসম্ভব। পাশাপাশি, এককভাবে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও ঔষধ শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংগত করতে হবে। শ্রম বাজারের সনাতনী ধারা বদলে কেবল অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, যা রেমিট্যান্সের গুণগত মান নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, ডলারের একাধিপত্য ও বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সার্ক বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোকে সক্রিয় করে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া জরুরি, যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিকূলতা এড়িয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কখনোই পুরোপুরি ন্যায্য হবে না, কারণ এর চালিকাশক্তি হলো ক্ষমতা এবং মুনাফা। আমাদের বুঝতে হবে যে, ‘সাহায্য’ বা ‘ঋণ’ কখনো নিঃস্বার্থ হয় না। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক ব্যবস্থা যেখানে প্রবৃদ্ধি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব।

​বাংলাদেশের জন্য ঋণের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। যদি ঋণের টাকা স্বচ্ছতার সাথে ব্যবহৃত হয় এবং বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তবেই আমরা এই নির্ভরশীলতার বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারব। অন্যথায়, আমরা কেবল জিডিপির কাগুজে বৃদ্ধিতেই আটকে থাকব, আর সাধারণ মানুষের কাঁধে চেপে বসবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলা এক বিশাল ঋণের বোঝা। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই কঠিন দাবার বোর্ডে আমাদের কেবল ‘গুটি’ হলে চলবে না, বরং নিজেদের চাল নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে কোস্টগার্ডের তৎপরতা: চড়পাড়া ঘাটে অবৈধ ভোজ্যতেল উদ্ধার

চট্টগ্রামে সিএমপি ডিবির ঝটিকা অভিযান: ১৫০ রাউন্ড বিদেশি গুলিসহ ২ অস্ত্র ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

লালমনিরহাট সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির সতর্কতা জারি

আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার ধুনটের উপজেলা চেয়ারম্যান খোকন

ঢাবির টিএসসিতে কক্সবাজার স্টুডেন্ট ফোরামের মিলনমেলা

ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও উগ্রবাদী সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন

কাপাসিয়ায় প্রবাসীর স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা

শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তী ঘিরে উৎসবের আমেজ, কুঠিবাড়িতে তিন দিনের জাতীয় আয়োজন

ঋণ বনাম সার্বভৌমত্ব: বৈশ্বিক অর্থনীতির বেড়াজালে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা

বিজিবি’র অভিযানে ভারতীয় গাঁজাসহ এক ম‌হিলা আটক

১০

নোয়াখালীতে পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক

১১

জাবিতে নীলফামারী জেলা সমিতির আয়োজনে নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনা

১২

চা বাগানের হাসপাতাল থেকে অজগর উদ্ধার

১৩

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা

১৪

শাপলা চত্বর ও বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে জাতীয় সেমিনার

১৫

আজ বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস

১৬

দৌলতপুরে চাল বিতরণে পুরোনো লেবেল, স্থানীয়দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

১৭

বগুড়া কে সিটি ও চার জেলায় নতুন পাঁচ উপজেলার অনুমোদন

১৮

ফুলবাড়ীতে ১১ বছরের শিশু ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, ঘটনায় চাঞ্চল্য

১৯

সীমা‌ন্তে বি‌জি‌বির ৩০লক্ষ টাকা মূ‌ল্যের কাপড় জব্দ

২০