
খাদ্য, ভ্যাকসিন, ওষুধ ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় বগুড়ার ধুনটে পোলট্রি ও লেয়ার মুরগির প্রান্তিক খামারিরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে, আর টিকে থাকা খামারিরা প্রতি মাসে লোকসান গুনছেন। ব্যবসাটি এখন হুমকির মুখে।
খামারিরা জানান, মুরগির খাবার, ভ্যাকসিন, ওষুধ, বাচ্চা ও বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের প্রভাব। ফলে বাজারে ডিমের দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচ সামলে লাভ করা যাচ্ছে না। গত এক মাসে কয়েক দফায় খাবারের দাম বস্তাপ্রতি দুই শতাধিক টাকা বেড়েছে। এতে জেলার কয়েকশ খামার ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। দেনার ভারে অনেকে নিঃস্ব হওয়ার পথে, কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ধুনটে নিবন্ধিত মুরগির খামার ১৯টি। এর বাইরে লেয়ার মুরগির ফার্ম ২২৩টি, ব্রয়লার ৬২৮টি ও সোনালী মুরগির ফার্ম ৯৩২টি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন লেয়ার খামারিরা।
চৌকিবাড়ির খামারি তোফায়েল আহমেদ বলেন, খাবারের পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও ওষুধসহ নানা উপকরণের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। খাবার আর ডিমের উৎপাদনের হিসাব মেলালে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, পাঁচ হাজার মুরগির খামার চালাতে এখন প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাঁর এলাকার অনেক খামারই বন্ধের উপক্রম। তবে নিজস্ব উপায়ে খাদ্য তৈরি করায় তাঁরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন।
কালেরপাড়া হাইস্কুল সংলগ্ন খামারি ওয়াজেদ হোসেন বলেন, ভ্যাকসিন, খাদ্য ও ডিমের দামের মধ্যে কোনো মিল নেই। ডিমের দাম ১০ টাকার নিচে নেমে এলে লোকসানে বিক্রি করতে হয়। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ায় খামারিদের ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়েছে।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, আগে যে মুরগির খাবারের বস্তা ২ হাজার ৯০০ টাকায় মিলত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়।
ফিড বিক্রেতারাও দাম বাড়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। মথুরাপুরের পোলট্রি ফিড বিক্রেতা মো. লিটন বলেন, শুধু সেপ্টেম্বরেই দুই দফা দাম বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে যে ব্রয়লারের খাবার ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। লেয়ারের খাবার ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৩ হাজার ৫৫০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। ওষুধের দাম অল্প বাড়লেও এখনো নাগালের মধ্যে।
ধুনট হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ডের তোফায়েল ট্রেডার্সের মালিক আবু তাহের বলেন, খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে, এর সঙ্গে বাড়তে পারে ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন ওষুধের দামও। কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মুরগির রোগবালাইও বেড়েছে। পাঁচথুপী গ্রামের বড় খামারি কামরুল ইসলামের পাঁচ হাজার মুরগির খামার এখন বন্ধ। ব্লাড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রায় ১ হাজার ৫০০ মুরগি মারা গেছে। বাকিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর ক্ষতি ১১ লাখ টাকার বেশি। ঋণ শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, প্রাণিসম্পদ অফিসে নিবন্ধন করলেও তিনি কখনো পরামর্শ, ভ্যাকসিনসহ কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রাণিসম্পদ অফিস গবাদিপশু নিয়ে কাজ করলেও খামারিদের নিয়ে তেমন আগ্রহী নয়।’
এই সংকটের মধ্যে ডিমের দাম নিয়েও বিপাকে খামারিরা। আবু তালেব নামের এক খামারি জানান, প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে খামার করেছিলেন তিনি। কিন্তু শুরু থেকেই কম দামের কারণে লাভ তো দূর, উল্টো লোকসান হচ্ছে। গত মাসে প্রতিটি ডিম ১১ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হলেও এ মাসে তা ৯ টাকায় নেমেছে। মাঝে দাম কিছুটা বাড়লেও চাহিদা কমায় আবার কমে গেছে। আসন্ন শীতেও দাম বাড়ার সম্ভাবনা কম বলে তিনি মনে করেন। চালাপাড়ার খামারি মাসুদ হোসেনও বলেন, খাদ্য, বিদ্যুৎ, ভ্যাকসিন ও ওষুধের দাম বাড়া এবং ডিমের দাম কমায় খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেহানা খাতুন বলেন, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হয়। নিবন্ধিত খামারিদের আলাদাভাবে পরামর্শ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প চালানো হয়। খামারিদের তিনি অফিসে এসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিদের লোকসানের প্রধান কারণ মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও কাঁচামালের ক্রমাগত দাম বাড়া। দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে খামারিদের লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিবন্ধিত খামারিদের খোঁজ না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে বছরে একবার নিবন্ধন করে আর নবায়ন করেন না। ফলে তাঁরা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
প্রান্তিক খামারিরা এই সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চান। তাঁদের দাবি, মুরগির খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধসহ সব উপকরণের দাম সহনীয় রাখতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিম ও মুরগির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
খামারিরা মনে করেন, পোলট্রি শুধু উদ্যোক্তাদের জীবিকার মাধ্যম নয়। এর সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশের প্রাণিজ আমিষের জোগান। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মন্তব্য করুন