
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বগুড়ার ধুনটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারান ২৮ নিরীহ বাঙালি। তাঁদের স্মৃতি ধরে রেখেছে পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামের দুটি গণকবর। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদদের ভাগ্যে জোটেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। পরিচয়হীন ২১ শহীদের পরিচয় উদ্ধারে নেই উদ্যোগ, সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে গণকবর দুটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এমনকি হত্যাযজ্ঞের দিনটিতেও শহীদদের স্মরণে নেওয়া হয়নি কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ধুনট থানা ভবন থেকে প্রায় ২০০ গজ পূর্বে পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামে পাশাপাশি অবস্থিত গণকবর দুটি অবহেলায় পড়ে রয়েছে। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিংবা গণকবরের খোঁজখবর নিতে সেখানে কাউকে দেখা যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ বাঙালিদের আটক করে ধুনট শহরে নিয়ে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। পরে তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। একপর্যায়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ২৮ জনকে।
হত্যাযজ্ঞ শেষে শহীদদের মরদেহ ধুনট থানা ভবনের প্রায় ২০০ গজ পূর্বে পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামে পাশাপাশি দুটি গণকবরে দাফন করা হয়।
গণকবরের স্মৃতিফলকে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, শহীদদের মধ্যে পরিচয় জানা গেছে সাতজনের। তাঁরা হলেন কান্তনগর গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান, ভরনশাহী গ্রামের জহির উদ্দীন, মাঝবাড়ী গ্রামের ফরহাদ হোসেন, জিল্লুর রহমান ও পর্বত আলী, শিয়ালী গ্রামের নুরুল ইসলাম এবং চান্দারপাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফ। বাকি ২১ জনের নাম-পরিচয় আজও অজানা।
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পার হলেও পরিচয়হীন ২১ শহীদের পরিচয় শনাক্তে সরকারি কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একইভাবে গণকবর দুটি সংরক্ষণ, সংস্কার কিংবা সেখানে যথাযথ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণেরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে তাঁরা শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কিংবা সরকারি সহায়তা পাননি। দেশের স্বাধীনতার জন্য স্বজনদের আত্মত্যাগের পরও তাঁদের পরিবারগুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। তাঁরা গণহত্যায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান এবং স্বজনহারা পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ধুনট উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম ফেরদৌস আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাক সেনাদের গুলিতে নিহতদের পরিবারগুলোকে সহায়তা এবং শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাবি জানানো হলেও কোনো সুফল মেলেনি। অথচ আজকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ গণহত্যা দিবসেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। এমনকি কেউ গণকবরটি দেখতেও আসেননি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, অবহেলায় পড়ে থাকা ঐতিহাসিক গণকবর দুটি দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ আমার সঙ্গে দেখা করেছেন, কিন্তু এ বিষয়ে তাঁরা আমাকে কিছু জানাননি। বিগত বছরগুলোতে এ দিবস উপলক্ষে কোনো আয়োজন হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও আমি অবগত নই। তাঁরা আয়োজন করতে চাইলে আমরা অবশ্যই সঙ্গে থাকব।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও ধুনটের ২৮ শহীদের স্মৃতিবিজড়িত গণকবরের এমন অবহেলা স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের উদাসীনতার চিত্র তুলে ধরছে। শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গণকবর সংরক্ষণ, পরিচয়হীন শহীদদের পরিচয় অনুসন্ধান এবং তাঁদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি এখন সময়ের।
মন্তব্য করুন