
শীতের আগমন পুরোপুরি শুরু না হলেও বগুড়ার ধুনট উপজেলায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। বাজারে মৌসুমের শুরুতেই সবজি তুলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও পরিচর্যায় দিন কাটছে তাঁদের। অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভের মুখ দেখার প্রত্যাশা করছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও জমি চাষ ও সার প্রয়োগ চলছে, কোথাও রোপণ করা হচ্ছে সবজির চারা। আগাম লাগানো গাছের পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার এবং পোকামাকড় দমনের কাজেও ব্যস্ত কৃষকেরা। কিছু জমিতে ইতিমধ্যে উৎপাদিত সবজি তুলে বাজারে নেওয়া হচ্ছে।
ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শসা, টমেটো, মুলা, লাউ, করলা, মরিচ, শইলা, পালংশাক ও ধনেপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে মাঠজুড়ে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মাঠগুলোতে সবজি চাষে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। উপজেলায় সিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, করলা, বেগুন, মরিচ, মুলা, লাউ, পটল, বরবটি, গাজর, পালংশাক, লাল শাকসহ হরেক রকমের সবজি চাষ হচ্ছে। কৃষকরা রোদে পুড়ে সবজির খেত পরিচর্যা করছেন। কেউ চারার পরিচর্যা করছেন আবার কেউ সার-বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। এছাড়াও যারা পিছিয়ে পড়েছেন তারা জমি প্রস্তত, বীজ রোপনে তোড়জোড় শুরু করেছেন।
৩৫ হেক্টর বেড়েছে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ধুনটে ১ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৬৫১ হেক্টর। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ৩৫ হেক্টর জমিতে বেশি সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবি মৌসুম শুরুর পর এখন পর্যন্ত উপজেলায় ৩৩৮ হেক্টরের বেশি জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় আগাম আবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
উপজেলার পাঁচথুপী গ্রামের কৃষক জহির উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরুতেই সবজি বাজারে তুলতে পারলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভের আশা করা যায়।
১৫ শতক জমিতে টমেটো চাষ করছি, শুরুতে বৃষ্টির কারণে কিছু চারা মারা গেলেও এখন সেটা পুষিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।
কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এ ধরনের চাষে জমি প্রস্তুত, সার, সেচ ও পোকামাকড় দমনে বাড়তি খরচ করতে হয়। প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে।
মথুরাপুর ইউনিয়নের বেলাল হোসেন বলেন, শীতকালীন একাধিক সবজি চাষ করছি। গতবার শুরুর দিকে ভালো দাম পেলেও শেষের দিকে তুলনামূলক লোকশান হয়েছিল তবে আশা রাখি এবার ভালো দাম পাব শুরুর এবং শেষে।
একই উপজেলার কৃষক রিপন মিয়া এবার ১৮ শতক জমিতে করলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, সার ও বীজ কিনতে ইতিমধ্যে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সুতা, বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণে ব্যয় হয়েছে আরও ৯ হাজার টাকা। সবজি বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা হতে পারে। বাজারদর ভালো থাকলে ওই জমির করলা বিক্রি করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
পারলক্ষীপুর গ্রামের আব্দুল মোমিন বলেন, বেগুন, শিম, টমেটো, মিলে ৪০ শতক জমিতে আগাম সবজি চাষ করেছি। এ বছর বৃষ্টির কারণে আগাম সবজি চাষে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। এজন্য একটু বেশি পরিচর্যা করতে হয়েছে। অনেক খরচ পড়ছে। তবে অসময়ে বাজারে এই সবজির চাহিদা থাকে অনেক। এ কারণে এই সবজিগুলো বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা যায়। তাই আগাম শীতকালীন সবজি চাষে আমাদের আগ্রহ বেশি থাকে।
গতবার ভালো দাম পাওয়ায় মানুষও এবারেও কৃষকেরা শীতকালীন আগাম সবজিতে স্বপ্ন বুনছেন। অসময়ে বৃষ্টি এবং পোকামাকড়সহ কোন সমস্যা না হলে তারা ভালো ফলনের আশাবাদী।
ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সামিদুল ইসলাম, বাজারে সবজির ভালো দাম থাকায় কৃষকেরা আগাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে কৃষকেরা সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে ভালো ফলন পেতে পারেন।
আধুনিক পদ্ধতিতে কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষ করা সম্ভব। শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন এবং সবজি চাষে কোনো প্রকার সমস্যায় না পড়েন এজন্য আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখছি।
কৃষকদের সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সুষম সার, জৈব সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের জন্য মাঠ পর্যায়ে তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া ও ন্যায্য বাজারদর বজায় থাকলে আগাম সবজি চাষ তাঁদের আয় বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারদরের ওঠানামা তাঁদের লাভের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
মন্তব্য করুন