
আজ বুধবার, ২৬ আগস্ট, পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। দিনটি মুসলিম বিশ্বের কাছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পরিচিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মরণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আরবের মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সে তিনি মা আমিনাকেও হারান। পরবর্তীতে তিনি মানবজাতির জন্য আল্লাহর শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাওহিদ, ন্যায়, মানবতা, সাম্য ও শান্তির বার্তা প্রচার করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
পবিত্র এ দিন উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, জিকির-আজকার, দোয়া, দান-সদকা এবং অন্যান্য নেক আমলে অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই নফল ইবাদতের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করছেন।
এ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে ওয়াজ মাহফিল, কিরাত, হামদ-নাতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামারা মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম, চরিত্র ও মানবিক আদর্শ নিয়ে আলোচনা করবেন।
এ ছাড়া জাতীয় মসজিদের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সেমিনার, সিরাত স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে রচিত কবিতা পাঠের আয়োজন।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটিও রয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি কালিমা তায়্যিবা সম্বলিত ব্যানার টানানো হয়েছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দেশবাসী এবং বিশ্বের মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁরা মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
কী আমল করা যেতে পারে
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে কী ধরনের ইবাদত করা উচিত—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ, বিশেষ দোয়া কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যায় জিকিরের বিধান নেই। তবে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার, দান-সদকা ও অসহায় মানুষের সহযোগিতা করা সাধারণভাবে নেক আমল হিসেবে স্বীকৃত।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের প্রতি দয়া—এসব গুণ নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা নবীজির শিক্ষা অনুসরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোরআনে মহানবী (সা.)-কে মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশও রয়েছে। ফলে এ দিনে তাঁর সিরাত পাঠ, পরিবারের সদস্যদের তাঁর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে জানানো এবং তাঁর চরিত্র অনুসরণের অঙ্গীকার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষ রোজা কি আছে?
মহানবী (সা.)-এর সোমবারের রোজা সম্পর্কে সহিহ হাদিসে তাঁর জন্মদিনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এ বছর ১২ রবিউল আউয়াল বুধবার হওয়ায় ওই হাদিসকে ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য আলাদা নির্ধারিত রোজার নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। কেউ সাধারণ নফল রোজা রাখতে চাইলে শরিয়তসম্মত নিয়মে তা পালন করতে পারেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বার্ষিক ধর্মীয় আয়োজন করা নিয়েও মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, সিরাত আলোচনা ও মানুষকে খাবার দেওয়ার মতো শরিয়তসম্মত নেক কাজের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর জন্মস্মরণকে বৈধ মনে করেন। অন্যদিকে আরেকদল আলেম প্রাথমিক যুগে এ ধরনের বার্ষিক আয়োজনের নজির না থাকায় এটিকে ধর্মীয়ভাবে পৃথক উৎসব হিসেবে পালনের বিরোধিতা করেন।
তবে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের গুরুত্ব নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। তাই পবিত্র এ দিনে ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, জিকির, দোয়া, সিরাত পাঠ, দান-সদকা এবং মানবিক কাজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নবীজির শিক্ষা স্মরণ করা যেতে পারে।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর ন্যায়, দয়া, সত্যবাদিতা, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা প্রতিদিনের জীবনে বাস্তবায়ন করাই হতে পারে পবিত্র এ দিনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।
মন্তব্য করুন