
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো গঠিত হয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু)। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ শুরু হলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও কুকসু গঠনের দাবি জোরালো হয়। তবে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এর কেন্দ্রীয় অংশ রিভিউ হলেও হল সংসদ অংশের রিভিউ এখনো হয়নি। ফলে নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়াও আটকে আছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই কুকসু গঠনের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬তম সিন্ডিকেট সভায় কুকসুর গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য পৃথক পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও পরে সময়সীমা আরও ১০ কর্মদিবস বাড়ানো হয়।
এরপর ২৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কুকসুর খসড়া গঠনতন্ত্র প্রকাশ করা হয়। এতে কেন্দ্রীয় সংসদে ২১টি এবং হল সংসদে ১১টি পদের প্রস্তাব রাখা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত আহ্বান করা হয়।
পরবর্তীতে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, কুকসুর গঠনতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন পেয়েছে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গঠনতন্ত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে একটি সভায় গঠনতন্ত্রের কেন্দ্রীয় সংসদ অংশ রিভিউ করা হলেও হল সংসদের অংশ এখনো রিভিউ হয়নি। এরপর কুকসু নির্বাচন বা গঠনতন্ত্রের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
এ বিষয়ে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন বলেন, “আমরা গঠনতন্ত্র তৈরি করে দিয়েছি। গঠনতন্ত্র ইউজিসি হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চলে গেছে। সেখানে একটি মিটিং হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় কমিটির অংশটি রিভিউ হয়েছে। ইউজিসির প্রতিনিধি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা সেখানে ছিলেন। আরেকটি মিটিং করতে হবে, সেটি হল কমিটি নিয়ে। এই দুটি হওয়ার পর তারা চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।”
সম্প্রতি ১১ জুলাই ‘জুলাই প্রথম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কুকসু নির্বাচনের দাবি জানান ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা।
কুকসু গঠনের বিষয়ে লোক প্রশাসন বিভাগের ১৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান অন্তর বলেন, “আমরা সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীসহ সব অরাজনৈতিক সংগঠনের একটাই প্রত্যাশা—কুকসু হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। কিন্তু প্রশাসনের মধ্যে আমরা কোনো সদিচ্ছা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা যতবারই তাদের কাছে গিয়েছি, ততবারই কোনো না কোনো অজুহাত দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র সংসদ দরকার—এই বোধটাই প্রশাসনের মধ্যে কাজ করছে না। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবে।”
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাইম ভুঁইয়া বলেন, “শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া একটি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি কেন্দ্র হিসেবে কুকসু প্রয়োজন। আমরা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছি। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রশাসন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাক এবং সেই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের সামনে উন্মুক্ত করুক।”
তিনি আরও বলেন, “ছাত্র রাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে যে ভয় রয়েছে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে তা অনেকটা দূর হবে। শিক্ষার্থীরা তখন শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি দেখতে পারবে।”
বাংলা বিভাগের ১৫তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সাইফুল মালেক আকাশ বলেন, “ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকশিত হবে। এখান থেকেই তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হবে। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে কুবির শিক্ষার্থীদেরও প্রত্যাশা ছিল, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তারাও ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে। এ বিষয়ে ছাত্রদল সবসময় ইতিবাচক। তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য কতটা প্রস্তুত, সেটিও দেখতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, “আমি যোগদান করেছি এক মাসের মতো হয়েছে। এই বিষয়ে বর্তমানে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। খোঁজ নিয়ে তারপর জানাতে পারব। উপ-উপাচার্য এ বিষয়ে খোঁজ নিতে বললে আমরা উদ্যোগ নেব। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠি এলে তখন আমি সেখানে যেতে পারব।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, “উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত কুকসুর দাবিতে কেউ আসেনি। একজন ১০–১৫টি দাবি নিয়ে এসেছিলেন, যার মধ্যে কুকসুও ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাতীয় সংসদ না থাকায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। তবে বর্তমানে জাতীয় সংসদ থাকায় নির্ধারিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংসদের মাধ্যমেই বিষয়টি এগোতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, ‘ এ প্রক্রিয়ায় খসড়া প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি), এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, তারপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে পুনরায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যায়। এরপর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি হলে তা কার্যকর হতে পারে; অন্যথায় বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে হয়।’
মন্তব্য করুন