
সকাল সাড়ে দশটা। অন্য দিনের মতোই হয়তো সেদিনও ছোট্ট রামিসার ঘুম ভাঙার পর বাড়ির ভেতরে চলছিল পরিচিত ব্যস্ততা। দ্বিতীয় শ্রেণির সেই শিশুটির স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। হয়তো বিছানার পাশে রাখা ছিল ছোট্ট জুতোজোড়া, টেবিলের ওপর খোলা ছিল বাংলা বই, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল মায়ের ডাক – “তাড়াতাড়ি করো, স্কুলে যেতে দেরি হবে।” বড় বোন রাইসাও হয়তো অপেক্ষা করছিল, ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে বের হবে বলে।
সবকিছুই ছিল একটি সাধারণ দিনের মতো। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই সাধারণ সকাল পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নে। দরজার বাইরে পড়ে থাকে একপাটি জুতো, আর অন্যপাটিতে পা গলানোর আগেই থেমে যায় সাত বছরের একটি জীবনের সমস্ত স্বপ্ন। নিভে যায় একটি কোমল শৈশবের আলো। এই মৃত্যু কেবল একটি শিশুর মৃত্যু নয়। এটি আমাদের হৃদয়ের মৃত্যু। এটি সেই মানবিক মূল্যবোধের মৃত্যু, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের সভ্য সমাজ বলে দাবি করি।
পল্লবীর সেই বাড়ির তিনতলার করিডোরে যখন মা পারভীন আক্তার মেয়ের একটি জুতো পড়ে থাকতে দেখেন, তখন নিশ্চয়ই তাঁর বুকের ভেতর কেঁপে উঠেছিল অজানা আতঙ্ক। একজন মা সন্তানের বিপদ সবচেয়ে আগে অনুভব করেন। তিনি পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন, হয়তো বারবার ডেকেছিলেন – “আমার মেয়েটা কোথায়?” হয়তো কান্নাভেজা কণ্ঠে অনুরোধ করেছিলেন দরজা খোলার জন্য। কিন্তু সেই রুদ্ধ দুয়ার খোলেনি।
অথচ সেই দরজার ওপাশেই পড়ে ছিল তাঁর আদরের সন্তান – নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে, নিথর দেহে। পৈশাচিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে অপরাধ ঢাকার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল বাথরুমের একটি বালতিতে, আর তাঁর রক্তাক্ত দেহটি লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল খাটের নিচে।
ভাবুন তো সেই মুহূর্তটি। একটি শিশু হয়তো শেষবারের মতো বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছে, আর তাঁর মা কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। পৃথিবীতে এর চেয়ে অসহায় দৃশ্য আর কী হতে পারে? মায়ের সেই আর্তনাদ দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলেও ঘাতকের পাষাণ হৃদয়ে তা বিন্দুমাত্র করুণা জাগাতে পারেনি।
সাত বছরের একটি শিশুর দিকে ছুরি তুলতে একজন মানুষের হাত কীভাবে কাঁপে না? কীভাবে একটি শিশুর কান্না শুনেও হৃদয়ে সামান্য মমতা জাগে না? কীভাবে একজন মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে – যে একটি নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করেও শান্ত থাকতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু আইনের কাছে নয়, পুরো সমাজের কাছেই সবচেয়ে বড় ভয়।
রামিসা ছিল এদেশের উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ। সে স্থানীয় ‘পপুলার মডেল হাই স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থী ছিল। তাকে ঘিরে পরিবারের পাহাড়সম স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই মেধা, সেই সম্ভাবনাকে এক নিমিষেই পিষ্ট করে দেওয়া হলো। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে প্রথমে পৈশাচিক নির্যাতন ও পরে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংসতা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। এখানে শুধু একটি প্রাণ যায়নি; এখানে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং গোটা সমাজের নিরাপত্তাবোধকে হত্যা করা হয়েছে।
অভিযুক্ত সোহেল রানা পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। মাত্র দুই মাস আগে ওই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেছিল সে। সম্ভবত সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলত, তাই কেউ হয়তো তাকে সন্দেহ করার প্রয়োজনও মনে করেনি। কারণ আমরা সাধারণত প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করি। আমাদের সংস্কৃতিতে “প্রতিবেশী” শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভরসা, সহযোগিতা ও আত্মীয়তার অনুভূতি। বিপদে-আপদে স্বজনের আগেই প্রতিবেশী ছুটে আসে, এই বিশ্বাস নিয়েই মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। কিন্তু পল্লবীর এই ঘটনা সেই বিশ্বাসকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ প্রশ্ন করছে – কোন দরজাকে নিরাপদ ভাববে? কাকে বিশ্বাস করবে? কার হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে হায়েনার বীভৎসতা?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনা সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শিশু নির্যাতন ও হত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো খবর নয়; বরং তা নৈতিক অবক্ষয়ের চরম প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তিতে আমরা উন্নত হচ্ছি, আকাশচুম্বী দালান বানাচ্ছি, কিন্তু মানুষ হিসেবে কি আমরা সত্যিই এগোচ্ছি? শিক্ষা বাড়ছে, অথচ মানবিকতা যেন কমছে।
আজকের সমাজে শিশুর নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, রঙপেন্সিল আর খেলনা, সেই বয়সেই তারা শিকার হচ্ছে বিকৃত মানসিকতার মানুষের। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো – এই হুমকি অনেক সময় অপরিচিত কারও কাছ থেকে নয়; বরং পরিচিত মানুষের কাছে থেকেই আসে। ফলে পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর অভিযুক্ত লাশ গুমের চেষ্টা করে এবং বাথরুমের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, অপরাধটি শুধু হঠাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং অপরাধ ঢাকার সুস্পষ্ট চেষ্টা ছিল। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তৎপরতায় পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অভিযুক্তকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই দ্রুত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এই বিচার কি রামিসার শূন্যতা পূরণ করতে পারবে? তাঁর বাবার সেই হাহাকার আজ প্রতিটি নাগরিকের কানে বাজছে। বিচারের প্রতি চরম অনাস্থা জানিয়ে তিনি বলেছেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়ে আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো নজির নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন আলোচনা চলবে, আবার অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটাও ধামাচাপা পড়ে যাবে।”
একজন বাবার এই কথাগুলো রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার জন্য চরম লজ্জাজনক। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে ডুবে গেছে, তা কি কোনো বিচার পূরণ করতে পারবে? একটি মা তাঁর সন্তানকে আর কখনো বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন না। বড় বোন আর কখনো ছোট বোনের হাত ধরে স্কুলে যেতে পারবে না। একটি ঘরের ভেতর যে হাসির শব্দ ছিল, তা চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে।
বিগত কয়েক মাসে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন চরম আকার ধারণ করেছে। অতি সম্প্রতি সিলেটে ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা, নেত্রকোনায় ১১ বছরের শিশুকে যৌন নির্যাতন এবং নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ১৫ বছরের কিশোরীকে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা দেশবাসীকে স্তব্ধ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ৭৭৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং অন্তত ৮১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। উপরন্তু, এসব মামলার মাত্র ৩ শতাংশের কম অপরাধীর সাজা হওয়া প্রমাণ করে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতটা জেঁকে বসেছে। ঘরে-বাইরে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে—কোথাও আজ আমাদের মা-বোন ও শিশুরা নিরাপদ নয়।
বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলা, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আজ অপরাধীদের এমন বেপরোয়া করে তুলেছে। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলার বিচার অনেক সময় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে অনেক অপরাধী শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়িয়ে যায়। আবার কখনো এমন দেরিতে বিচার হয় যে তা সমাজে কার্যকর বার্তা দিতেও ব্যর্থ হয়। ফলে অপরাধীদের মনে ভয় তৈরি হয় না। রামিসার ক্ষেত্রেও যেন এমন না হয়।
এই অমানবিক পৈষাচিক ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি শুধু একজন অপরাধীর বিচার নয়; এটি পুরো সমাজের কাছে একটি বার্তা – শিশুর প্রতি সহিংসতার কোনো ক্ষমা নেই। এমন কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা দেখে অন্য কোনো ‘সোহেল রানা’ কোনো শিশুর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস না পায়।
আজ পল্লবীর বাতাস ভারী হয়ে আছে এক অসহায় মায়ের কান্নায়। হয়তো রামিসার মা এখনও মেয়ের জামা বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন। হয়তো এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন – এই বুঝি ছোট্ট মেয়েটি দৌড়ে এসে বলবে, “মা, আমি এসেছি।” কিন্তু কিছু অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না। হয়তো রামিসার বাবাও এখনও স্তব্ধ হয়ে ভাবছেন মেয়ের সেই শেষ আবদারটির কথা, যে বোরকাটি কিনে দেওয়ার জন্য রামিসা তাঁর কাছে বায়না ধরেছিল। কিন্তু মেয়ের সেই ছোট্ট ইচ্ছাটি পূরণ করার সুযোগ আর তিনি পেলেন না। এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো সমাজের শোক। কারণ প্রতিটি শিশুই একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে না পারলে সমাজ কখনো নিরাপদ হতে পারে না।
এখন সময় এসেছে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশের নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। নতুন ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা, ভবনে সিসিটিভি স্থাপন, শিশুদের একা চলাফেরা সীমিত করা, প্রতিবেশীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও নজরদারি বৃদ্ধির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, সমাজ, প্রশাসন – সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা আর কোনো রামিসার রক্তে আমাদের সমাজকে কলঙ্কিত হতে দেখতে চাই না। আমরা চাই এমন এক সমাজ, যেখানে একটি শিশু নির্ভয়ে খেলতে পারবে, স্কুলে যেতে পারবে, পাশের ফ্ল্যাটে যেতে ভয় পাবে না। আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিবেশীর দরজা হবে নিরাপত্তার প্রতীক—আতঙ্কের নয়। কারণ, একটি শিশুর নিরাপদ হাসিই একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মন্তব্য করুন