সর্বশেষ
||কুড়িগ্রামে অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট মোস্তাক গ্রেপ্তার, ল্যাপটপ ও মোবাইল জব্দ||বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম নূরুল ইরফান||প্রেস ডেস্ক বিডির ডিভিশনাল ইনচার্জ (ডিআই) হিসেবে দায়িত্ব পেলেন রেজাউল ইসলাম মাসুদ||চট্টগ্রাম মেডিকেলে কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা||বগুড়ার মোটেলে রহস্যজনক মৃত্যু, প্রযুক্তির সহায়তায় আটক প্রেমিকা||নবীনদের স্বাগত জানিয়ে বগুড়া শাহ্ সুলতান কলেজ ছাত্রদলের শুভেচ্ছা মিছিল||জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদারে
বিপিডব্লিউএন-এর কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সভা অনুষ্ঠিত
||বন্দরে চাঞ্চল্যকর চুরি: ১৫ লাখ টাকার মোবাইল ডিসপ্লে উদ্ধার, গ্রেফতার ১||হোসেনপুরে প্রণোদনা বঞ্চিতদের নিয়ে প্রশাসনের মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত||শিশু সুরক্ষা: সহানুভূতির নয়, নীতির প্রশ্ন
এলিন মাহবুব, কলামিস্ট
৭ জুন ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শিশু সুরক্ষা: সহানুভূতির নয়, নীতির প্রশ্ন

Share this news with

রামিসার মৃত্যু কেবল একটি শিশুর মৃত্যু নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেকের সামনে দাঁড় করানো একটি কঠিন প্রশ্ন। প্রতিবার কোনো শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে আমরা শোকাহত হই, ক্ষোভ প্রকাশ করি, বিচার দাবি করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই সমস্যার মূল কারণ খুঁজছি, নাকি শুধু প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর সাময়িক আবেগে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি?

একটি সভ্য সমাজে শিশু সুরক্ষা কোনো সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি একটি নীতিগত, নৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বিষয়। কারণ শিশুরা নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা নিশ্চিত করতে পারে না। তারা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তাই কোনো শিশুর ক্ষতি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক বিলিয়ন শিশু কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। এই সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অবহেলা, শোষণ এবং অনলাইন নির্যাতন। গবেষণা বলছে, শৈশবের সহিংস অভিজ্ঞতা একজন মানুষের সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাগত অর্জন, কর্মজীবন এবং সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে নিয়ে যায় শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।

আধুনিক শিশু অধিকার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো প্রতিটি শিশুর জীবন সমান মূল্যবান। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি এই নীতিকে অনুসরণ করি? আমরা কি শিশুদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি শুধুমাত্র ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে?

আমাদের সমাজে শিশুদের প্রায়ই বলা হয়, “বড়দের প্রশ্ন করো না”, “চুপ থাকো”, “পারিবারিক বিষয় বাইরে বলো না”। এই নীরবতার সংস্কৃতি শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সহযোগী। অনেক শিশু বিপদের সংকেত দিলেও কেউ তা শুনতে চায় না। অনেক শিশু ভয়, লজ্জা কিংবা অবিশ্বাসের কারণে কথা বলতে পারে না। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পায়।

শিশু সুরক্ষার আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো দেখায়, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সাধারণত চারটি স্তরের ব্যর্থতা থেকে জন্ম নেয় ব্যক্তি, পরিবার, সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্র। যখন পরিবারে সচেতনতার অভাব থাকে, সমাজে নজরদারি দুর্বল হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থার অভাব থাকে এবং রাষ্ট্র কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তখন শিশুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

রামিসা একা নয়। তার আগে আরও অসংখ্য শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়ে গেছে—সেসব ঘটনার কতগুলোতে দ্রুত ও কার্যকর বিচার হয়েছে?

যখন কোনো অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে যায়, যখন সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, যখন ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়ায়, তখন সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে অপরাধ করেও হয়তো পার পাওয়া সম্ভব।

অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে আইনের ভয় কমে যায় এবং অপরাধের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কঠোর শাস্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিশ্চিত শাস্তি। অপরাধী যদি জানে যে অপরাধ করলে ধরা পড়বে, দ্রুত বিচার হবে এবং শাস্তি অনিবার্য, তাহলে অপরাধের হার কমার সম্ভাবনা বাড়ে।

রামিসার জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু একজন অপরাধীর শাস্তি নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়, যেখানে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়ে ন্যায়বিচার অস্বীকারে পরিণত না হয়।

একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার জায়গা হলো পরিবার।শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে নির্ভয়ে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। যদি কোনো শিশু বলে, “আমি ভয় পাচ্ছি”, “আমি অস্বস্তি বোধ করছি”, বা “কেউ আমাকে কষ্ট দিয়েছে”, তাহলে তাকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষা দিলেই পিতামাতার দায়িত্ব শেষ হয় না। আবেগীয় নিরাপত্তা, বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক এবং সচেতন তদারকি শিশু সুরক্ষার মৌলিক ভিত্তি।

শিশু সুরক্ষা শুধু পরিবারের কাজ নয়। স্কুল, মসজিদ, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রতিবেশী এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা রয়েছে।

এক সময় একটি পাড়ার শিশুকে পুরো পাড়া চিনত। আজকের নগরজীবনে সেই সামাজিক সংযোগ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আমরা প্রায়ই পাশের বাড়ির শিশুর নামও জানি না। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিশুদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পদ্ধতি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশু যেন জানে বিপদে পড়লে কোথায় যাবে, কার কাছে সাহায্য চাইবে।

“পরিকল্পনা ও নকশায় শিশু সুরক্ষা” ধারণাটি আসলেই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে যুগোপযোগী এবং শক্তিশালী একটি দর্শন। অর্থাৎ, কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে শিশুদের ঝুঁকি শুরু থেকেই কমিয়ে আনা যায়।শিশুবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ স্কুল পরিবেশ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এসব শিশু সুরক্ষার অংশ।

রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে মাপা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা সফল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সেই রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।

রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে। আমরা হয়তো কিছুদিন শোক পালন করব, ক্ষোভ প্রকাশ করব, বিচার দাবি করব। কিন্তু যদি আমরা কাঠামোগত পরিবর্তন না আনি, তাহলে ভবিষ্যতে আরও রামিসা আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করবে।

শিশুরা ভবিষ্যতের নাগরিক নয়; তারা আজকের নাগরিক। তাদের জীবন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি একটি মৌলিক অধিকার।

একটি সমাজের প্রকৃত সভ্যতা তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের প্রতি আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাই শিশু সুরক্ষা কেবল আবেগের বিষয় নয়, কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়, কেবল শোকের বিষয়ও নয়।

শিশু সুরক্ষা মানবাধিকারের প্রশ্ন। শিশু সুরক্ষা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন। সর্বোপরি, শিশু সুরক্ষা সহানুভূতির নয় নীতির প্রশ্ন।

Share this news with

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুড়িগ্রামে অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট মোস্তাক গ্রেপ্তার, ল্যাপটপ ও মোবাইল জব্দ

বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম নূরুল ইরফান

প্রেস ডেস্ক বিডির ডিভিশনাল ইনচার্জ (ডিআই) হিসেবে দায়িত্ব পেলেন রেজাউল ইসলাম মাসুদ

চট্টগ্রাম মেডিকেলে কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

বগুড়ার মোটেলে রহস্যজনক মৃত্যু, প্রযুক্তির সহায়তায় আটক প্রেমিকা

নবীনদের স্বাগত জানিয়ে বগুড়া শাহ্ সুলতান কলেজ ছাত্রদলের শুভেচ্ছা মিছিল

জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদারে
বিপিডব্লিউএন-এর কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সভা অনুষ্ঠিত

বন্দরে চাঞ্চল্যকর চুরি: ১৫ লাখ টাকার মোবাইল ডিসপ্লে উদ্ধার, গ্রেফতার ১

হোসেনপুরে প্রণোদনা বঞ্চিতদের নিয়ে প্রশাসনের মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

শিশু সুরক্ষা: সহানুভূতির নয়, নীতির প্রশ্ন

১০

ভূরুঙ্গামারীতে
সীমান্ত ক্লিনিকে সিজারকালে নবজাতকের মাথা কাটার অভিযোগ, থানায় অভিযোগ দায়ের

১১

যুবদলের পূর্নাঙ্গ নির্বাহী কমিটি ঘোষণায় বরগুনায় আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ

১২

সম্পূরক বৃত্তি পাচ্ছেন জবি শিক্ষার্থীরা

১৩

মৌলভীবাজারে ১২০ পিস ইয়াবাসহ ডিবির জালে কারবারি

১৪

চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হামলা, এনসিপি নেতাকর্মীসহ আহত বেশ কয়েকজন

১৫

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দৌলতপুরে বিড়ি শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, ঘণ্টাব্যাপী যান চলাচল বন্ধ

১৬

ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশু ও যুব কল্যাণে জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা

১৭

টাঙ্গন নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন: পীরগঞ্জে চালকসহ ২ জনের কারাদণ্ড

১৮

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসীর মরদেহ দেশে, এলাকায় শোকের ছায়া

১৯

ধুনটে ইয়াবাসহ আটক কাজিপুরের যুবক, গ্রেপ্তার ২ মাদক কারবারি

২০