
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত একটি সেতু জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফাটল দেখা দিয়েছে। শনিবার বিকেলে খুলে দেওয়ার পর রাতেই সেতুর একটি অংশে দৃশ্যমান ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।ঘটনাটি ঘটেছে হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন বোর্ডেরহাট এলাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলজিইডির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেছে। ফলে চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেতুতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যদি একটি সেতুতে ফাটল দেখা দেয়, তাহলে প্রকল্পের বাকি অবকাঠামোগুলোর গুণগত মান কতটা নিরাপদ, প্রায় ১৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না,সেটিও এখন স্থানীয় দের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, হাতীবান্ধা উপজেলার দৈখাওয়া কলেজ থেকে ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের বুড়ির বাজার পর্যন্ত ৯ হাজার ৩০০ মিটার সড়ক সংস্কার এবং চারটি সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। সড়ক সংস্কার ও সেতু নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
স্থানীয় জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে বোর্ডের হাট এলাকার সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয় এবং শনিবার বিকেলে সেটি যান ও জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। অপর তিনটি সেতুও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গোলাম মাওলা।
বোর্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা হবিবর রহমান বলেন,সড়ক সংস্কারের আওতায় বোর্ডেরহাট এবং কালভৈরবের মাঝামাঝি স্থানে একটি ২৩ মিটার ব্রীজ নির্মিত হয়।ব্রীজটি ঢালাইয়ের সময় দরপত্র অনুযায়ী রড,সিমেন্ট,বালু ব্যাবহার না করায় ব্রীজের সার্টার খোলার পর বিভিন্ন জায়গায় গর্ত ও ফোঁপা দেখা দেয়,অতিমুনাফার লোভে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রীজ ঢালাই করার সময় ভাইব্রেশন না করায় ঢালাই সার্টার পযন্ত পৌছায়নি,ফলে বিভিন্ন জায়গায় গর্ত এবং ফোঁপা থেকে যায়।এতে করে ব্রীজের আয়ুস্কাল নিয়ে সন্দেহ রয়ে যাবে,ঢালাই কালীন সময় তদারকি প্রতিষ্ঠান এলজিইডির প্রতিনিধিকে ম্যানেজ করে নিম্ন মানের কাজ করায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে।ব্রীজের গর্ত এবং ফোঁপা স্থান ঢেকে দিতে ঠিকাদার গত মঙ্গলবার তড়িঘড়ি করে সিমেন্টের প্রলেপ দেন।শনিবার এপ্রোচ সড়কের মাটি ভরাট করে তড়িঘড়ি করে সেতুটি যান চলাচলে খুলে দিলে,রাতেই ব্রীজে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়।
নিম্নমানের কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির থানা প্রকৌশলীকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবী জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন,যদি সড়ক ও সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়,তাহলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের যোগসাজশে এই প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে আমরা মনে করি।”
এ বিষয়ে প্রকল্পের ঠিকাদার গোলাম মাওলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সড়ক ও সেতুর বিষয়ে যা জানার, এলজিইডির প্রকৌশলীর কাছ থেকে জেনে নিন।” এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাতীবান্ধা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আখতার হোসেন। তিনি বলেন, “মূল সেতুতে কোনো ফাটল দেখা দেয়নি। সেতুর প্রোটেকশন স্ট্রাকচারের একটি অংশে সামান্য ফাটল হয়েছে। মাটি ভরাটের চাপের কারণে এমনটি হয়েছে। বিষয়টি আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি এবং ঠিকাদারকে তা মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পের কাজ এখনও চলমান রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এলজিইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এই পর্যায়ে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়লে তা সংশোধনের দায়িত্ব ঠিকাদারের।
লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম বলেন, “আমি বিষয়টি শুনেছি। খুব দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে। প্রয়োজন হলে সেতু ও সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হবে। পুরো প্রকল্পটি খতিয়ে দেখা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্তব্য করুন