
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিলোত্তমা রায় যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ওয়েন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নে (ফুল-ফান্ডেড) পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। দীর্ঘ অধ্যবসায়, একাডেমিক কৃতিত্ব এবং গবেষণার প্রতি নিবেদনের মাধ্যমে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেছেন। তার এই অসাধারণ অর্জনে তার পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে।
তিলোত্তমা রায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। স্নাতকে তিনি সিজিপিএ ৩.৯৪ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৮৩ অর্জন করেন এবং মেধাতালিকায় শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় (IELTS) তিনি ৬.৫ স্কোর অর্জন করেন।
তার এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। তিনি মাস্টার্স অধ্যয়নকালে একসঙ্গে ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা এবং চাকরির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রথমে একটি ঔষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে অফিসার মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এ থিসিস গবেষণার কাজ চালিয়ে যান। পরে স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর আরেকটি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন এবং চাকরির পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যান।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে তিনি প্রথমবার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। সে সময় একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আংশিক অর্থায়নের অফার পেলেও তিনি সেটি গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তিনি আরও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নিয়ে পুনরায় আবেদন করেন এবং অবশেষে ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পূর্ণ অর্থায়নের পিএইচডি অফার লাভ করেন।
তিলোত্তমা জানান, একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি তার গবেষণা অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এবং শক্তিশালী স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি) নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, “মাস্টার্সের সময় একসঙ্গে চাকরি, ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার কাজ করেছি। সময়টা খুব কঠিন ছিল, কিন্তু আমি কখনো থেমে যাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার একাডেমিক ফলাফল এবং একসঙ্গে এতগুলো দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে।”
গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। তার একটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একটি গবেষণা প্রকাশনার অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি আরেকটি নতুন গবেষণা কার্যক্রম চলমান। বর্তমানে তিনি নিউমোনিয়ার জন্য সম্ভাব্য ওরাল ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণার ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বলে জানান তিনি।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিলোত্তমা বলেন, “আমার নিজের সঙ্গে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতদূর এগোনো সম্ভব। আমি সেই সমালোচনাগুলোকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছি। সবসময় বিশ্বাস করেছি, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আজকের এই অর্জন আমার দীর্ঘ সংগ্রাম, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের ফল।”
তিনি আরও বলেন, “আমার স্বপ্ন শুধু বিদেশে পড়াশোনা করা নয়, গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা। ভবিষ্যতে গবেষণার ফলাফল দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চাই।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একাডেমিক কৃতিত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার, অলিম্পিয়াড এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তিলোত্তমা। এসব কার্যক্রম তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তিলোত্তমা রায়ের এই অর্জন এক অনুপ্রেরণার গল্প। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, একসঙ্গে পড়াশোনা ও চাকরির চাপ এবং নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে কঠোর অধ্যবসায়, সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখা সম্ভব।
মন্তব্য করুন